নিজস্ব প্রতিবেদক:
সনাতন পদ্ধতির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশের কৃষি। এখন আর কেবল অভ্যাসের বশে চাষাবাদ নয়; বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর কৃষকের হাতে-কলমে শেখা দক্ষতার সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন পথ। এই আধুনিক কৃষিযাত্রায় বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘টিস্যু কালচার প্রযুক্তি’।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ল্যাবে উৎপাদিত রোগমুক্ত ও উচ্চফলনশীল চারা এখন কৃষকের মাঠে সোনালি ফসল ফলাচ্ছে।
গবেষণা থেকে মাঠে
দেশে টিস্যু কালচার নিয়ে আগে যতটা আলোচনা হতো, তার সিংহভাগই ছিল গবেষণাগার আর সম্ভাবনার ফাইলে বন্দী। তবে সেই চিত্র এখন পাল্টেছে। মাদারীপুর, বগুড়ার বনানী আর ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী হর্টিকালচার সেন্টারের ল্যাবে এখন আর শুধু গবেষণা হয় না; সেখানে বাণিজ্যিকভাবে জন্ম নিচ্ছে লাখ লাখ চারা।
সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে এবং নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতা ও তাপমাত্রায় উৎপাদিত হচ্ছে জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, জারবেরা, অর্কিড, স্টিভিয়া ও আলুর মতো উচ্চমূল্যের ফসলের চারা।
রোগমুক্ত চারা ও দ্বিগুণ ফলন
উদ্ভিদকে তার স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির ঝুঁকি আর সীমাবদ্ধতা থেকে সরিয়ে এনে কোষ-টিস্যু থেকে নতুন চারা গড়ে তোলাই এই প্রযুক্তির মূল ম্যাজিক। কৃষিবিদরা জানান, টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা হয় শতভাগ রোগবালাইহীন এবং বাড়ে দ্রুত। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ জি-৯ কলা।
সাধারণ জাতের তুলনায় এই কলার ফলন প্রায় দ্বিগুণ। গাছ সহজে রোগে আক্রান্ত হয় না, কাঁদি বা ছড়িগুলো হয় সুষম এবং বাজারে দামও পাওয়া যায় ভালো। ফলে কৃষকরা এই চারা রোপণে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
কমছে আমদানি নির্ভরতা
কিছুদিন আগেও জারবেরা ফুলের চারা সংগ্রহের জন্য দেশের কৃষকদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো ভারতের ওপর। অন্যদিকে এমডি-২ জাতের আনারসের সাকার আসত ফিলিপাইন থেকে। আমদানিকৃত এসব চারার দাম যেমন বেশি ছিল, তেমনি সব সময় পাওয়াও যেত না।
টিস্যু কালচার প্রকল্পের ফলে সেই নির্ভরতা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। ল্যাবে উৎপাদিত দেশীয় চারাগুলো এখন সহজলভ্য এবং মানের দিক থেকেও বিদেশি চারার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এতে কৃষকের খরচ কমছে এবং বেঁচে যাচ্ছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
সাফল্যের পরিসংখ্যান
প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে তিনটি ল্যাব পূর্ণদমে কাজ করছে। ইতিমধ্যে এসব ল্যাব থেকে এক লাখের বেশি অনুচারা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- আলু: ২৫,০০০ টি
- আনারস: ১৪,০০০ টি
- স্ট্রবেরি: ১০,২০০ টি
- অর্কিড: ৯,০০০ টি
- জারবেরা: ৮,৩০০ টি
- জি-৯ কলা: ৭,২৫০ টি
- স্টিভিয়া: ৮০০ টি
অর্থনৈতিকভাবেও এই প্রকল্প সাফল্যের মুখ দেখছে। চলতি মাসে শুধু আলুর অনুচারা বিক্রি করেই সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। ডিসেম্বর থেকে প্রতিটি ল্যাবের মাসিক বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল শুরু। বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালা ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি হর্টিকালচার সেন্টারের ল্যাবগুলো পুরোপুরি চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এই ল্যাবগুলো উৎপাদনে গেলে দেশে টিস্যু কালচার চারার জোগান আরও বাড়বে, যা দেশের কৃষিতে এক বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.