মাল্টা উৎপাদনে দেশের শীর্ষে তিন পার্বত্য জেলা: কম খরচে অধিক লাভে ঝুঁকছেন কৃষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের সমতল ভূমিতে মাল্টা চাষ বাড়লেও উৎপাদনের দিক থেকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট উৎপাদিত মাল্টার প্রায় ১৮ শতাংশই আসছে এই তিন জেলা থেকে। পাহাড়ি ঢালে কম খরচে অধিক ফলন ও ভালো দাম পাওয়ায় জুম চাষের পরিবর্তে মাল্টা চাষে ঝুঁকছেন পাহাড়ের কৃষকরা।

পাহাড়ে সবুজের সমারোহ ও ব্যস্ত কৃষক

সরেজমিনে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি ও চিম্বুক পাহাড় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ের ঢালে সারি সারি গাছের ডালে ঝুলছে সবুজ মাল্টা। এখন ফল তোলার ভরা মৌসুম। তাই বাগানগুলোতে চলছে উৎসবমুখর ব্যস্ততা। শ্রমিকরা গাছ থেকে পরিপক্ব ফল সংগ্রহ করে স্তূপ করে রাখছেন।

রোয়াংছড়ির মাল্টা চাষি মংমংসিং বলেন, “বিদেশি মাল্টার চেয়ে আমাদের দেশি মাল্টার দাম কম, কিন্তু স্বাদ ও পুষ্টিতে কম নয়। তাই বাজারে এর চাহিদা বেশি। ভালো দাম পাওয়ায় চাষিরা দিন দিন আগ্রহী হচ্ছেন।”

পরিসংখ্যানে এগিয়ে পাহাড়

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে মোট ১৭ হাজার ৮০০ একর জমিতে ৭৩ হাজার ৫৯৫ টন মাল্টা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে রাঙামাটি অঞ্চলের (তিন পার্বত্য জেলা) ৩ হাজার ৪১৯ একর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৪৩ টন মাল্টা।

জেলাভিত্তিক উৎপাদনে:

  • খাগড়াছড়ি: ১,৫৬০ একরে ৫,৮৩৯ টন।
  • বান্দরবান: ১,১৯৭ একরে ৪,৬৮৬ টন।
  • রাঙামাটি: ৬৬২ একরে ২,৫১৮ টন।

উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল অঞ্চল (১০,৪৬০ টন) এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল (৫,১৬৪ টন)।

বানিজ্যিক সম্ভাবনা ও লাভ

পাহাড়ে মূলত ‘বারি-১’ ও ভিয়েতনামি জাতের মাল্টা চাষ হচ্ছে। মার্চ-এপ্রিলে গাছে ফুল আসে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ফল আহরণ শুরু হয়। বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা পাইকারি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে বিদেশি মাল্টার দাম ২০০-২৫০ টাকা।

খাগড়াছড়ির চাষি প্রতিবিন্দু দেওয়ান লাভের অংক জানিয়ে বলেন, “আমি আড়াই একর জমিতে মাল্টা চাষ করেছি। পরিচর্যাসহ মোট খরচ হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। চলতি মৌসুমে মাল্টা বিক্রি করে পেয়েছি প্রায় ৬ লাখ টাকা।”

হাইলাইটস

মোট উৎপাদন: তিন পার্বত্য জেলায় ১৩ হাজার ৪৩ টন।

দ্বিতীয় অবস্থান: বরিশাল অঞ্চল (১০,৪৬০ টন)।

জাত: মূলত বারি-১ ও ভিয়েতনামি মাল্টা।

বাজারদর: দেশি মাল্টা ৬০-৮০ টাকা কেজি।

আয়ের সুযোগ: আড়াই একর জমিতে ২ লাখ টাকা খরচ করে ৬ লাখ টাকা আয়ের নজির।

ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট

একসময় পাহাড়িদের বাড়ির আঙিনায় নিজেদের খাওয়ার জন্য মাল্টা গাছ লাগানো হতো। ২০০৫ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘সাইট্রাস উন্নয়ন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে পাহাড়ে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ শুরু হয়। ২০১৯ সালে এই প্রকল্প সমতলে ও পাহাড়ে আরও বিস্তৃত করা হয়, যার সুফল এখন মিলছে।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

ফলন ভালো হলেও কিছু চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা। জেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মেথুইচিং মারমা জানান, অনেক চাষি ফল পুরোপুরি পাকার আগেই বা রং আসার আগেই সেপ্টেম্বরের শুরুতে ফল তুলে ফেলেন। ফলে মাল্টার রং সবুজ থাকে এবং বাজারে কিছুটা কম দাম পাওয়া যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বান্দরবানের উপপরিচালক আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দিন বলেন, “পাহাড়ে মাল্টা চাষ সম্প্রসারণের আরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এটি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা অন্য ফলের বদলে মাল্টায় ঝুঁকছেন। তবে বর্তমানে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প না থাকায় আমরা কেবল পরামর্শ দিতে পারছি, আনুষঙ্গিক বড় সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন