‘আউটলুক ২০৫০’: ১৩ থিম্যাটিক এরিয়ায় কৃষির রূপরেখা, কমবে কীটনাশক ব্যবহার

  • মহাপরিকল্পনা: ‘আউটলুক ২০৫০’ শিরোনামে ২৫ বছরের কৃষি রোডম্যাপ প্রকাশ, যেখানে ১৩টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
  • জলবায়ু ঝুঁকি: তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ধানের ফলন ১৫-২০% কমার শঙ্কা; অভিযোজনে বিশেষ গুরুত্ব।
  • নিরাপদ খাদ্য: ২০৫০ সালের মধ্যে ৭০% জমিতে জৈবিক বালাইনাশক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা।
  • যান্ত্রিকীকরণ: কৃষিশক্তি প্রাপ্যতা বাড়াতে আগামী ২৫ বছরে ৪৪ হাজার মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন।
  • গ্যাপ বাস্তবায়ন: ২০২৮ সালের মধ্যে ৩ লাখ হেক্টর জমি ‘উত্তম কৃষিচর্চা’র আওতায় আনা হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশের কৃষি হবে সম্পূর্ণ টেকসই, জলবায়ু সহনশীল এবং রফতানিমুখী। সনাতন পদ্ধতির বদলে জোর দেওয়া হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যান্ত্রিকীকরণ এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে।

২০৫০ সালের সেই উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন সামনে রেখে কৃষিখাতকে ঢেলে সাজাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

‘ট্রান্সফর্মিং বাংলাদেশ এগ্রিকালচার: আউটলুক ২০৫০’ শীর্ষক এই ঐতিহাসিক পথনকশায় কৃষিকে ১৩টি সুনির্দিষ্ট ‘থিম্যাটিক এরিয়া’ বা খাতে ভাগ করে উন্নয়নের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

২৮ জান্যারি রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত জাতীয় কর্মশালায় কৃষি মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) যৌথভাবে এই মহাপরিকল্পনার খসড়া উপস্থাপন করে।

 এই মহাপরিকল্পনার মূল ভিত্তি হলো কৃষির ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এর মধ্যে রয়েছে—পুষ্টি নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা, কৃষি মূল্য সংযোজন, কৃষিপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিকীকরণ, কোল্ড চেইন বা শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ)।

পরিকল্পনাটি বাস্তবসম্মত করতে দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলে কৃষক ও অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ সভা করা হয়েছে। সেখানে প্রতিটি অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ, চাষাবাদ পদ্ধতি ও বাজার বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে ২০৫০ সাল পর্যন্ত চাহিদা ও সরবরাহের পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে।

কর্মশালার উদ্বোধনে কৃষি উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী একে বাংলাদেশের কৃষির জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, “আগামী ২৫ বছরে কৃষির এই রূপান্তর দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন শুধু কৃষি খাত নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও জরুরি।”

কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান নয়, বরং ২০৫০ সাল পর্যন্ত কৃষি খাতকে আমরা কোথায় দেখতে চাই, সেই ‘ভিশন’ বাস্তবায়ন করা।”

মহাপরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা মোকাবিলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

কৃষি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলন জানান, গত চার দশকে দেশে তাপমাত্রা গড়ে প্রতি দশকে প্রায় ০ দশমিক ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। ভবিষ্যতে ‘গরম রাতের’ সংখ্যা বাড়বে, যা ফসলের জন্য ক্ষতিকর।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “সঠিক অভিযোজন ব্যবস্থা না নিলে ধানের ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এছাড়া বৃষ্টি অনিয়মিত হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা আরও বিস্তৃত হবে।”

এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের পর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যকে প্রতিযোগিতামূলক করতে ‘উত্তম কৃষিচর্চা’ (গ্যাপ) ও স্যানিটারি কমপ্লায়েন্সকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ জানান, ২০২৮ সালের মধ্যে ৩ লাখ হেক্টর জমিকে উত্তম কৃষিচর্চার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

একইসঙ্গে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ জমিতে আইপিএম (IPM) ও জৈবিক বালাইনাশক ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ‘ডিজিটাল সয়েল হেলথ কার্ড’ চালুর কথাও বলা হয়েছে পরিকল্পনায়।

কৃষিকে লাভজনক করতে যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মঞ্জুরুল আলম জানান, বর্তমানে হেক্টরপ্রতি কৃষিশক্তি প্রাপ্যতা ৩ দশমিক ২৪ কিলোওয়াট। ২০৫০ সালে এটিকে ৫ দশমিক ১৯ কিলোওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী ২৫ বছরে প্রায় ৪৪ হাজার মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

এছাড়া বর্তমানে দেশে ৩৯৩টি কোল্ডস্টোরেজ থাকলেও তার অধিকাংশই আলু সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। নতুন পরিকল্পনায় ফল ও সবজির অপচয় রোধে কৃষককেন্দ্রিক সমন্বিত কোল্ড চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাতের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে।

কর্মশালায় পরিকল্পনা কমিশন, এফএও, ইউএনডিপি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, কূটনীতিক, গবেষক ও উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন