পটল খেতে নাক সিঁটকান? জানলে অবাক হবেন কী কী পুষ্টি হারাচ্ছেন!

নিজস্ব প্রতিবেদক:

গ্রীষ্মকালীন সবজি হিসেবে পরিচিত হলেও পটল এখন সারা বছরই বাজারে পাওয়া যায়। সহজলভ্য এই সবজিটি ভাজি বা তরকারি হিসেবে অনেকের কাছে প্রিয় হলেও, অনেকেই বিশেষ করে শিশুরা এটি খেতে খুব একটা পছন্দ করে না।

কিন্তু পুষ্টিবিদরা বলছেন, অবহেলিত এই সবজিটি পুষ্টিগুণে রীতিমতো ‘পাওয়ার হাউস’। হজমশক্তি বাড়ানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ, লিভার পরিষ্কার রাখা থেকে শুরু করে হৃদরোগ প্রতিরোধে পটল দারুণ কার্যকর।

যারা পটল এড়িয়ে চলেন, তারা আসলে নিজেদের অজান্তেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ইউএস বাংলা মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ মাহফুজা নাসরিন শম্পা সম্প্রতি পটলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পটলের জুড়ি মেলা ভার।

পুষ্টির আধার: কী আছে পটলে? পুষ্টিবিদ মাহফুজা নাসরিন শম্পা বলেন, “পটল একটি কম ক্যালরিযুক্ত অথচ অত্যন্ত পুষ্টিকর সবজি। এতে রয়েছে ভিটামিন এ, সি এবং কিছু পরিমাণে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। খনিজ উপাদানের মধ্যে আছে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাস।”

এছাড়া এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং উচ্চমাত্রার ডায়েটারি ফাইবার রয়েছে, যা দেহের সামগ্রিক সুস্থতা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।কেন খাবেন পটল? ১০টি প্রধান উপকারিতা

১. হজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে: পটলে উপস্থিত উচ্চমাত্রার আঁশ বা ফাইবার পাচনতন্ত্রের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পুষ্টিবিদ জানান, এটি গ্যাস্ট্রিক, অম্বল, বদহজম এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর। হজমজনিত সমস্যায় যারা ভুগছেন, তাদের জন্য পটল একটি নিরাপদ প্রাকৃতিক সমাধান।

২. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক: যারা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য পটল একটি আদর্শ খাবার। এতে ক্যালরি ও ফ্যাট খুব কম থাকায় এটি শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে দেয় না। পাশাপাশি আঁশযুক্ত হওয়ায় পেট ভরা রাখে, ফলে বারবার খাওয়ার প্রবণতা কমে।

৩. ডায়াবেটিস রোগীদের বন্ধু: পটলের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়। ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী সবজি।

৪. হৃদরোগ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: পটলে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়ায়, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।

আরও পড়ুন …

৫. লিভার ডিটক্স ও সুরক্ষা: পটলের প্রাকৃতিক উপাদানগুলো লিভার পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন বের করে দেয়। এতে জন্ডিস ও হেপাটাইটিসের মতো লিভার রোগের ঝুঁকি কমে।

৬. কিডনি ও মূত্রনালীর যত্ন: পটল একটি প্রাকৃতিক ‘ডাইইউরেটিক’ বা প্রস্রাববর্ধক হিসেবে কাজ করে। এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য অপসারণে সহায়তা করে। যারা প্রস্রাবে জ্বালা বা ইনফেকশনে ভুগছেন, তাদের জন্য এটি উপকারী।

৭. শরীর ঠান্ডা রাখে: পটলের প্রকৃতি ঠান্ডা। গরমে শরীর জ্বালাপোড়া, ক্লান্তি এবং ডিহাইড্রেশনের সমস্যা কমাতে এটি বেশ কার্যকর।

৮. ত্বক ও চোখের যত্ন: ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ হওয়ায় পটল ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায় এবং চর্মরোগ প্রতিরোধ করে। এছাড়া এটি দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে এবং রাতকানা রোগ রোধে সহায়তা করে।

৯. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: এতে থাকা ফ্ল্যাভনয়েড ও বিটা-ক্যারোটিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ প্রতিরোধ করে। ফলে সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর ও ফ্লু থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হয়।

১০. চুল ও রক্তস্বল্পতা রোধ: পটলে থাকা আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি জিঙ্ক ও ম্যাগনেশিয়াম চুল পড়া রোধ করে এবং নখ মজবুত রাখে।

পুষ্টিবিদের বিশেষ পরামর্শ পুষ্টিবিদ মাহফুজা নাসরিন শম্পা সতর্ক করে বলেন, “শুধু পটল খেলেই যে শরীর ভালো থাকবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের সঙ্গে নিয়মিত খাদ্যতালিকায় পটল রাখতে হবে।”

তিনি রান্নার পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “বেশি তেল ও মসলা ব্যবহার করলে পটলের পুষ্টিগুণ নষ্ট হতে পারে। তাই পুষ্টি অটুট রাখতে পাতলা তরকারি বা সেদ্ধ করে খাওয়াটাই সবচেয়ে উত্তম।”

আরও পড়ুন …


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন