নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি:
একসময় মাইনী নদীর তীরের কৃষি মানেই ছিল তামাকের আধিপত্য আর জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার। কিন্তু সেই চিত্র এখন অতীত হতে চলেছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মাইনী নদীর তীরবর্তী শনখোলা পাড়ায় এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। ক্ষতিকর তামাক চাষ ছেড়ে কৃষকরা ঝুঁকছেন পরিবেশবান্ধব ও বিষমুক্ত সবজি চাষে।
রাসায়নিকের কটু গন্ধের পরিবর্তে এখন সেখানে সবুজের সমারোহ। কীটনাশক ছাড়াই উৎপাদিত হচ্ছে লাউ, শসা, ক্ষীরাসহ নানা সবজি, যা বিক্রি হচ্ছে ক্ষেত থেকেই।
সরেজমিন চিত্র সম্প্রতি শনখোলা পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ক্ষেতজুড়ে সবুজ লতায় ভরা মাচা। পাতার ফাঁকে ঝুলছে কচি শসা ও লাউ। পুকুরপাড়েও চলছে সমন্বিত চাষাবাদ। এসব ফসলে কোনো রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে না। প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত এসব সবজির স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এর চাহিদাও ব্যাপক।
পরিবর্তনের কারিগর ও কৃষকের গল্প বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘তৃণমূল’-এর হাত ধরে এই ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। গত দুই বছর ধরে সংস্থাটির উদ্যোগে পাড়ার অন্তত ৪০ জন কৃষক রাসায়নিকমুক্ত চাষাবাদে যুক্ত হয়েছেন। প্রায় ২২ একর জমিতে চলছে এই পরিবেশবান্ধব কৃষি কার্যক্রম।
স্থানীয় কৃষক শৈলেন্দ্র প্রসাদ চাকমা মাইনী নদীর পাড়ে তার এক একর বসতভিটায় গড়ে তুলেছেন সমন্বিত খামার। তিনি বলেন, “আগে লাভের আশায় তামাক চাষ করতাম এবং প্রচুর রাসায়নিক সার ব্যবহার করতাম। কিন্তু এখন বুঝেছি, প্রাকৃতিক উপায়েও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। এখন আমি পুকুরে মাছ, ধান ও কচু চাষের পাশাপাশি পাড়ে লাউ ও নানা সবজি চাষ করছি। বিষমুক্ত হওয়ায় বাড়ি থেকেই মানুষ সবজি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।”
আরেক নারী উদ্যোক্তা তুহিনা চাকমা ২০ শতাংশ জমিতে ক্ষীরা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি বাড়িতে তৈরি কেঁচো সার ও জৈব সার ব্যবহার করি। কীটনাশকমুক্ত হওয়ায় বাজারে নেওয়া মাত্রই সবজি বিক্রি হয়ে যায় এবং দামও ভালো পাওয়া যায়।”
সহায়ক ভূমিকা ও জৈব সারের জোগান বিষমুক্ত চাষাবাদে কৃষকদের সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় নারী উদ্যোক্তারাও। উপজেলার বড়াদাম এলাকার রেশমি চাকমা বাণিজ্যিকভাবে ‘ভার্মি কম্পোস্ট’ ও ‘ভার্মি ওয়াশ’ (তরল জৈব সার) উৎপাদন করছেন। রেশমি জানান, “ভার্মি ওয়াশ ব্যবহার করলে গাছে রোগবালাই কম হয় এবং কীটনাশকের প্রয়োজন পড়ে না। বছরে আমি প্রায় এক লাখ টাকার ভার্মি কম্পোস্ট বিক্রি করেছি।”
কমছে তামাকের আগ্রাসন দীঘিনালা উপজেলা একসময় তামাক চাষের জন্য পরিচিত ছিল। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত বছরও উপজেলায় প্রায় ৪৫০ জন কৃষক ২০০ একর জমিতে তামাক চাষ করেছিলেন। তবে প্রাকৃতিক ও বিষমুক্ত চাষাবাদের লাভজনক দিকটি কৃষকদের সামনে আসায় তামাক চাষের প্রবণতা কমতে শুরু করেছে।
‘তৃণমূল’-এর প্রকল্প কর্মকর্তা স্যুইচিং অং মারমা বলেন, “তামাক চাষে মাটি ও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। আমরা চাই কৃষকরা তামাকের বদলে নিরাপদ শস্য উৎপাদনে আগ্রহী হোক। পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেই আমরা ক্ষুদ্র কৃষকদের নিয়ে কাজ করছি।”
কর্মকর্তাদের ভাষ্য দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “প্রকৃতিভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীটনাশকমুক্ত ফসল উৎপাদনই কৃষির ভবিষ্যৎ। মাইনী নদীর পাড়ে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা কৃষক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের জন্যই ইতিবাচক।”
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.