নিজস্ব প্রতিবেদক:
মাথার ওপর প্রবল শব্দে উড়ছে একটি ক্ষুদ্র যান্ত্রিক পাখি। নিচ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ফসলের মাঠে ছড়িয়ে দিচ্ছে কুয়াশার মতো মিহি আস্তরণ। না, এটি কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্য নয়; এটি বাংলাদেশের অজপাড়াগাঁয়ের বর্তমান কৃষির বাস্তব চিত্র। দেশের কৃষিতে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক ‘ড্রোন প্রযুক্তি’। যে কাজটি করতে একজন কৃষকের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, সেই কাজ এখন ড্রোন করছে চোখের পলকে।
সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ থেকে বেরিয়ে স্মার্ট কৃষির দিকে হাঁটছে বাংলাদেশ। কাস্তে দিয়ে ধান কাটার বদলে যেমন হারভেস্টারের ব্যবহার বেড়েছে, তেমনি এবার সার ও কীটনাশক প্রয়োগে ড্রোনের ব্যবহার কৃষিতে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রযুক্তি শুধু সময় বা অর্থই সাশ্রয় করছে না, বরং কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে চাষাবাদকে করে তুলছে আরও আধুনিক ও নিরাপদ।
সময় ও অর্থের জাদুকরী সাশ্রয়
এক বিঘা জমিতে কীটনাশক ছিটাতে একজন কৃষিশ্রমিকের সাধারণত সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। অথচ একই কাজ ড্রোন দিয়ে করতে সময় লাগছে মাত্র ৩ থেকে ৫ মিনিট। সময়ের এই বিশাল ব্যবধানের পাশাপাশি কমেছে খরচের বোঝাও।
নরসিংদীর বেলাব ও মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে:
- সনাতন পদ্ধতি: শ্রমিক দিয়ে এক বিঘা জমিতে কীটনাশক ছিটাতে খরচ হয় ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা।
- ড্রোন প্রযুক্তি: একই জমিতে ড্রোনের মাধ্যমে স্প্রে করতে কৃষকের খরচ পড়ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।
অর্থাৎ, ড্রোন ব্যবহারে কৃষকের অর্ধেকেরও বেশি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়া হাতে ছিটানোর সময় অনেক ক্ষেত্রে কীটনাশকের অপচয় হয় বা জমিতে সমানভাবে পড়ে না। কিন্তু ড্রোনে জিপিএস প্রযুক্তি থাকায় জমির প্রতিটি অংশে সমানভাবে এবং পরিমিত মাত্রায় ওষুধ ছিটানো সম্ভব হচ্ছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্তি
প্রচলিত পদ্ধতিতে পিঠে স্প্রে মেশিন নিয়ে কীটনাশক ছিটানোর সময় কৃষকরা প্রায়ই বিষক্রিয়ার শিকার হন। বাতাসের বিপরীতে স্প্রে করার সময় বা দীর্ঘক্ষণ রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকায় শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরাসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভোগেন তারা। মাস্ক ব্যবহার করলেও ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না।
সাভারের বিরুলিয়া এলাকার কৃষক মোক্তার হোসেন তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “আগে ওষুধ দিতে গেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ত, অসুস্থ লাগত। কিন্তু এখন রিমোট কন্ট্রোলে ড্রোন চালিয়ে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এতে মেশিনের শব্দ ছাড়া আমাদের গায়ে কোনো বিষ লাগছে না। মাত্র কয়েক মিনিটেই কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে, যা আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত।”
প্রযুক্তির কারিগর যারা
দেশে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে ‘জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেড’ ও ‘ফ্লাইমেক’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। তাদের যৌথ উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় মাঠপর্যায়ে ড্রোনের ব্যবহার শুরু হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ব্যবহৃত ড্রোনগুলো চীনের যন্ত্রাংশ দিয়ে দেশেই অ্যাসেম্বল বা সংযোজন করা হচ্ছে। ফলে খরচ অনেকটা হাতের নাগালে রাখা সম্ভব হয়েছে। একটি কৃষি ড্রোন এখন ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ৫ কেজি ওজনের কীটনাশক বহনে সক্ষম। তবে ভবিষ্যতে ১০ থেকে ২০ লিটার সক্ষমতার ড্রোন তৈরির কাজ চলছে।
ফ্লাইমেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাওয়াদ রশিদ বলেন, “আমরা ড্রোন বিক্রির পাশাপাশি ভাড়ায় সেবা দেওয়ার ব্যবস্থাও রেখেছি। কেউ চাইলে অর্ধেক মূল্য, অর্থাৎ পৌনে দুই লাখ টাকা জমা দিয়ে ড্রোন নিতে পারবেন। বাকি টাকা পরে সার্ভিস ফি থেকে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। আগামী বছর থেকে আমরা পুরোদমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করব।”
কৃষকবান্ধব ব্যবসায়িক মডেল
ড্রোন প্রযুক্তিকে টেকসই করতে একটি ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। গ্রামের কৃষক সমিতি বা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ড্রোন পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেডের কৃষি বিভাগের প্রধান সমীরণ বিশ্বাস জানান, ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা গেলে একটি ড্রোন ভাড়ায় খাটিয়ে মাসে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। এতে গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তারা ‘ড্রোন পাইলট’ হিসেবে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন।
বর্তমানে নরসিংদী ও মানিকগঞ্জের প্রায় ২০০ কৃষকের ৫০ থেকে ৬০ একর জমিতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ড্রাগন ফলের বাগানে, যেখানে গাছের কাঁটার কারণে ভেতরে ঢুকে স্প্রে করা ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে ড্রোন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
বাংলাদেশের কৃষিজমিগুলো সাধারণত ছোট ছোট এবং খণ্ডবিখণ্ড। এটি ড্রোন ওড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ছোট জমিতে বারবার ড্রোন ওড়ানো ও নামানো সময়সাপেক্ষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধানে ‘সমবায় চাষাবাদ’ বা ‘ব্লক ফার্মিং’ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ, পাশাপাশি অবস্থিত কয়েকটি জমির কৃষক যদি একসঙ্গে ড্রোন সেবা নেন, তবে এক উড্ডয়নেই কয়েক বিঘা জমিতে স্প্রে করা সম্ভব হবে। এতে খরচ আরও কমে আসবে।
স্মার্ট কৃষির পথে আরও এক ধাপ
জিনিয়াস ফার্মস মূলত একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান, যারা গত পাঁচ বছর ধরে কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে কাজ করছে। তাদের তৈরি ‘ডাক্তার চাষি’ অ্যাপের মাধ্যমে ৪১টি প্রধান ফসলের রোগ নির্ণয় ও সঠিক কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ পাওয়া যায়। ড্রোনের সঙ্গে এই অ্যাপের সমন্বয় ঘটিয়ে তারা ‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ বা নিখুঁত কৃষিকাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ‘ড্রোন বাংলাদেশ’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডিজিআই (DJI) ড্রোন বাজারজাত করছে। তাদের কাছে ১৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দামের ড্রোন রয়েছে, যা ২০ থেকে ১০০ লিটার পর্যন্ত ভার বহনে সক্ষম। ড্রোন বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী কামরান আহমেদ জানান, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রকল্পে বড় ড্রোনের ব্যবহার বেশি হলেও কৃষকদের মধ্যে ১০ লিটারের ছোট ড্রোনের চাহিদা বাড়ছে। ভবিষ্যতে দেশেই অ্যাসেম্বল প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
একনজরে ড্রোন প্রযুক্তির সুবিধা:
- সময়: বিঘা প্রতি মাত্র ৩-৫ মিনিট।
- খরচ: বিঘা প্রতি ২০০-৩০০ টাকা (শ্রমিকের চেয়ে অর্ধেকেরও কম)।
- স্বাস্থ্য: বিষক্রিয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে।
- কার্যকারিতা: জিপিএস নিয়ন্ত্রণে সুষম স্প্রে ও অপচয় রোধ।
- কর্মসংস্থান: গ্রামীণ তরুণদের ড্রোন পাইলট হিসেবে আয়ের সুযোগ।
সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ
কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং সংকট মোকাবিলায় যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। হারভেস্টারের পর ড্রোন প্রযুক্তি সেই শূন্যস্থান পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে দেশের প্রতিটি গ্রামে ড্রোন প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এতে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, অন্যদিকে দেশি প্রযুক্তির বিকাশে সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা।
সব মিলিয়ে, ড্রোনের পাখায় ভর করে বাংলাদেশের কৃষি এখন প্রবেশ করছে এক নতুন যুগে, যেখানে প্রযুক্তি আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে নিশ্চিত হবে নিরাপদ খাদ্য ও কৃষকের সমৃদ্ধি।
আরও পড়ুন…
- এআই চালিত কৃষি: আগামীর বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের দিগন্ত
- ‘ড্রোন দিদি’: কৃষিক্ষেত্রে ড্রোন চালিয়ে আয় করছেন ভারতীয় নারীরা
- এআই ও ড্রোন ব্যবহারে আমবাগানে বিপ্লব: উৎপাদন বেড়েছে ৭ গুণ
- প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা
- কৃষিতে প্রযুক্তির বিপ্লব: ড্রোন, স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল সেবা আনছে সরকার
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.