নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় বাঙালির পাতে সবজি বলতে লাউ, কুমড়া, বেগুন বা পটোলের মতো দেশীয় সবজিই ছিল প্রধান। কিন্তু খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং রেস্তোরাঁ সংস্কৃতির বিকাশে সালাদ, নুডলস, পিৎজা বা চাইনিজ খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে একটি বিদেশি সবজি—ক্যাপসিকাম। ঝালহীন এই মরিচ বা বেল পেপার এখন আর কেবল শৌখিন পণ্য নয়, বরং এটি এখন বাণিজ্যিক কৃষির এক বড় সম্ভাবনার নাম।
গত চার বছরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ক্যাপসিকামের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। আর এই বিপ্লবের নেপথ্য নায়ক দ্বীপজেলা ভোলার চরাঞ্চলের কৃষকরা। দেশের মোট উৎপাদনের সিংহভাগই আসছে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া বিধৌত এই দ্বীপজেলা থেকে। লাভজনক হওয়ায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভোলার চরে এখন চলছে ক্যাপসিকাম চাষের ধুম।
পরিসংখ্যানের আয়নায় অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্যাপসিকাম উৎপাদনের গ্রাফটি বেশ ঊর্ধ্বমুখী।
- ২০২১-২২ অর্থবছর: দেশে ক্যাপসিকাম উৎপাদন ছিল মাত্র ১৫১ টন।
- ২০২৩-২৪ অর্থবছর: তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৪ টনে।
- ২০২৪-২৫ অর্থবছর: উৎপাদন আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭৫ টনে।
অর্থাৎ, মাত্র চার বছরের ব্যবধানে দেশে এই সবজির উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। শুধু উৎপাদনের পরিমাণই নয়, বেড়েছে জমির পরিমাণ ও একরপ্রতি ফলনও। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ১১১ একর জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ হয়েছিল, যা গত অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৯ একরে। আগে যেখানে প্রতি একরে ২ হাজার ৯২২ কেজি ফলন হতো, উন্নত পরিচর্যা ও প্রযুক্তির কারণে তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬ কেজিতে।
কেন ভোলাই ‘ক্যাপসিকাম রাজধানী’?
দেশজুড়ে ক্যাপসিকাম চাষ হলেও ভোলা জেলা এখন অঘোষিতভাবে ‘ক্যাপসিকামের রাজধানী’তে পরিণত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এলাকাভিত্তিক উৎপাদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ৩২৪ টন উৎপাদনের মধ্যে ২৬২ টনই এসেছে ভোলা থেকে।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিলেটে উৎপাদিত হয়েছে ১৫ টন এবং তৃতীয় অবস্থানে নওগাঁয় ১১ টন। এরপর চুয়াডাঙ্গা ও কুড়িগ্রামে ১০ টন করে উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়া, বগুড়া ও জয়পুরহাটেও এর ভালো ফলন হচ্ছে।
কিন্তু ভোলায় কেন এত ভালো ফলন? এ বিষয়ে ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক বলেন, “ভোলার চরের জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই পলি জমে থাকে, যা ক্যাপসিকাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চরাঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণের কারণেই এখানে ফলন সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। এছাড়া কৃষকরা কৃষি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করায় উৎপাদন বাড়ছে।”
কৃষকের লাভ ও মাঠের চিত্র
ভোলা সদরের মাঝের চরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজ ও রঙিন ক্যাপসিকামের সমারোহ। এখানকার চাষি মো. শাহজাহান এবার এক হেক্টরের বেশি জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করেছেন। তিনি জানান, তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবং বাম্পার ফলন হওয়ায় তিনি ১৫ লাখ টাকার বেশি ক্যাপসিকাম বিক্রির আশা করছেন।
শাহজাহান বলেন, “আগে মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি ১২০ টাকায় বিক্রি করতাম। এখন ভরা মৌসুমে দাম কিছুটা কমলেও ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে এতে লাভ বেশি।”
ভোলা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান জানান, উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি হয় ক্যাপসিকাম। ফলে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। ভোলার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এখান থেকে সরাসরি ক্যাপসিকাম ঢাকার কারওয়ান বাজারে চলে যায়। সেখান থেকে পাইকাররা সারা দেশে সরবরাহ করেন। ফলে কৃষকদের বিপণন নিয়ে খুব একটা ঝামেলা পোহাতে হয় না।
বাজারদর ও ক্রেতার আগ্রহ
উৎপাদন বাড়লেও বাজারে ক্যাপসিকামের দাম এখনো সাধারণ সবজির চেয়ে বেশি। ঢাকার খামারবাড়ির সামনের রাস্তায় দুই বছর ধরে ক্যাপসিকাম বিক্রি করা সুধীর চন্দ্র দে জানান, বাজারে সবুজ রঙের ক্যাপসিকামের চাহিদা ও সরবরাহ বেশি, দাম প্রতি কেজি ২২০ টাকা। অন্যদিকে লাল বা হলুদ রঙের ক্যাপসিকামের স্বাদ ও ঘ্রাণে ভিন্নতা থাকায় এর দামও বেশি, বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা কেজি দরে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে উৎপাদন বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসছে। ফাস্টফুড ও রেস্তোরাঁর পাশাপাশি এখন অনেক গৃহস্থালি রান্নাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে।
আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকারি উদ্যোগ
দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ ধরনের মসলা ব্যবহৃত হয়, যার বড় অংশই আমদানি করতে হয়। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার ২০২২ সালে ১২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের আওতায় দেশের ১১০টি উপজেলায় কাজ চলছে।
প্রকল্প পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, “আমরা উপজেলা পর্যায়ে কৃষকদের ক্যাপসিকাম উৎপাদনের আধুনিক পদ্ধতি শেখাচ্ছি। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা, সার ব্যবস্থাপনা এবং পোকামাকড় দমন নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদনের পর প্রদর্শনীও করা হচ্ছে। ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরাও প্রশিক্ষণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।”
বীজ ও গবেষণায় অগ্রগতি
দেশে ক্যাপসিকামের চাষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বীজের বাজারও বড় হচ্ছে। বর্তমানে এসিআই, ব্র্যাক ও এআর মালিক সিডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাপসিকামের বীজ বাজারজাত করছে। পাশাপাশি ভারত থেকেও বীজ আমদানি করা হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে। বারি-এর সবজি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. উবায়দুল্লাহ কায়ছার বলেন, “আমরা গবেষণা করে এ দেশের আবহাওয়ার উপযোগী তিনটি জাত উদ্ভাবন করেছি। বিএডিসির মাধ্যমে এই জাতগুলো কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।”
পুষ্টিগুণ ও উৎস
কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, ক্যাপসিকামের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষ করে মেক্সিকো ও পেরু অঞ্চলে। সেখান থেকে এটি এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। পুষ্টিগুণে অনন্য এই সবজিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’, ভিটামিন ‘এ’, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও ত্বকের উজ্জ্বলতা রক্ষায় বেশ কার্যকর।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এই চার মাস বাংলাদেশে ক্যাপসিকাম উৎপাদনের মৌসুম। এই সময়ে ৭ থেকে ১০ বার পর্যন্ত ফলন তোলা যায়। ভোলার চরের বালুকাময় মাটিতে এই বিদেশি সবজিটি এখন বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিনের সূচনা করেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ক্যাপসিকাম রপ্তানির তালিকায় নাম লেখাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.