নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালী:
একযুগ আগেও পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামটি ছিল আর দশটা সাধারণ গ্রামের মতোই। অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু জয়নাল আবেদীন ও জুলেখা বেগম দম্পতির হাত ধরে সেই গ্রামের চিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পরিহার করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে সবজি চাষ করে তারা সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাদের দেখাদেখি পুরো সোনাতলা গ্রামই এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘বিষমুক্ত সবজির গ্রাম’ হিসেবে।
লড়াইয়ের শুরু ও সাফল্যের গল্প আন্ধারমানিক নদীর কোল ঘেঁষে কুমিরমারা খালের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের এই গ্রামে ২০১০ সালে প্রথম বিষমুক্ত সবজি চাষ শুরু করেন জয়নাল-জুলেখা দম্পতি। একসময়ের দরিদ্র এই পরিবারটি এখন এলাকার অনুকরণীয় মডেল।
জুলেখা বেগম বলেন, “একসময় খুব কষ্টে ছিলাম। ১৫ বছর আগে কৃষি খামার করে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন শুরু করি। বর্তমানে বাড়ির সামনে দেড় একর জমিতে আমি এবং বাড়ি থেকে একটু দূরে তিন একর জমিতে আমার স্বামী সবজি বাগান দেখাশোনা করেন। আমরা রাসায়নিক সারের বদলে হলুদ স্টিকার, আঠালো ফাঁদ ও নিমের রসসহ বিভিন্ন জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করি।”
বিষমুক্ত সবজির আয় ও মেয়ের ক্যান্সার জয় এই দম্পতির জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল তাদের বড় মেয়ে মুক্তার অসুস্থতা। ২০১২ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মুক্তার জরায়ুতে দেড় কেজি ওজনের টিউমার ও ক্যান্সার ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি বাবা-মা।
জয়নাল আবেদীন জানান, বিষমুক্ত সবজি বিক্রির টাকায় মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে অপারেশন করান এবং দীর্ঘ আট মাস চিকিৎসা করান। চিকিৎসকরা বলেছিলেন মেয়েটি মা হতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে ক্যান্সারজয়ী মুক্তা ২০১৮ সালে বিয়ের পর এখন দুই সন্তানের জননী।
জুলেখা বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমরা মেয়ে এবং এলাকার মানুষকে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করে খাওয়াই বলেই হয়তো আল্লাহ মানুষের দোয়ায় মেয়েটাকে ক্যান্সারমুক্ত করেছেন। মেয়েটা এখন পুরোপুরি সুস্থ।”
বছরে লাভ ৮ লাখ টাকা নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা থাকায় জয়নাল-জুলেখা দম্পতির সবজির কদর সবার আগে। জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমরা স্বামী-স্ত্রী অনেকটা পাল্লা দিয়েই সবজি চাষ করি। আমাদের লাভ-খরচের হিসাবও আলাদা। লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, করলা, শিম, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপিসহ সব ধরনের সবজি চাষ করি। বাজারে সবাই আমার সবজি খোঁজে।”
তিনি আরও জানান, প্রতি মৌসুমে তারা ১০ থেকে ১১ লাখ টাকার সবজি বিক্রি করেন। খরচ বাদ দিয়ে বছরে নিট লাভ থাকে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। এই আয়ে তারা নতুন জমি কিনে চাষের পরিধি বাড়িয়েছেন এবং মেয়ের চিকিৎসার খরচসহ সংসার চালাচ্ছেন স্বচ্ছলভাবে।
গ্রামজুড়ে কৃষি বিপ্লব জয়নাল-জুলেখার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সোনাতলা গ্রামের চিত্র বদলে গেছে। আগে যারা তাদের ক্ষেতে শ্রমিকের কাজ করতেন, এখন তারা নিজেরাই উদ্যোক্তা।
প্রতিবেশী কৃষক জেসমিন আক্তার বলেন, “জুলেখা-জয়নাল দম্পতি এই গ্রামের মডেল। তাদের সাফল্য দেখে আমিও নিরাপদ সবজির বাগান করেছি। এতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি, পাশাপাশি মানুষও স্বাস্থ্যসম্মত সবজি খেতে পারছে।”
একনজরে সফলতার খতিয়ান
- উদ্যোক্তা: জয়নাল আবেদীন ও জুলেখা বেগম।
- স্থান: সোনাতলা গ্রাম, কলাপাড়া, পটুয়াখালী।
- পদ্ধতি: রাসায়নিকমুক্ত, জৈব সার ও ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার।
- বার্ষিক বিক্রি: ১০-১১ লাখ টাকা।
- বার্ষিক লাভ: ৭-৮ লাখ টাকা।
- অর্জন: পুরো গ্রাম এখন ‘বিষমুক্ত সবজির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, “জুলেখা-জয়নাল দম্পতির দেখাদেখি ওই গ্রামের ৫০ থেকে ৭০ জন কিষান-কিষানি এখন সবজি চাষে এগিয়ে এসেছেন। এটি কৃষি বিভাগের জন্য বড় অর্জন।”
বেসরকারি সংস্থা সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (এসডিএফ) ক্লাস্টার কর্মকর্তা চিত্তরঞ্জন বিশ্বাস জানান, তারা এই দম্পতিকে বিষমুক্ত সবজি চাষে প্রশিক্ষণ ও অনুদান দিয়ে সহায়তা করেছেন।
বিষমুক্ত সবজি চাষ করে জয়নাল ও জুলেখা শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাননি, তারা প্রমাণ করেছেন—সদিচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে নিরাপদ উপায়েও কৃষিতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.