‘পলিনেট হাউজ’ বিপ্লব: আধুনিক প্রযুক্তির চারা বদলে দিচ্ছে কৃষকের ভাগ্য

জয়পুরহাট প্রতিনিধি:

জয়পুরহাটের কৃষি মানচিত্রে যোগ হয়েছে এক নতুন অধ্যায়—‘পলিনেট হাউজ’। সনাতন পদ্ধতির বীজতলা থেকে বেরিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখানে উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের সবজির চারা। আক্কেলপুর উপজেলায় স্থাপিত এই পলিনেট হাউজটি এখন স্থানীয় কৃষকদের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত এই অত্যাধুনিক স্থাপনায় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে বারোমাসি চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এখান থেকে সুস্থ-সবল ও রোগমুক্ত চারা সংগ্রহ করে বাম্পার ফলন পাচ্ছেন কৃষকরা, যা তাদের লাভের নতুন পথ দেখাচ্ছে।

প্রযুক্তির কারিশমা: মাটি ছাড়াই চারা উৎপাদন

পলিনেট হাউজের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো চারা তৈরির মাধ্যম। এখানে সনাতন পদ্ধতির মতো কাদামাটিতে চারা তৈরি হয় না। ব্যবহার করা হয় ‘কোকোপিট’ (নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া)।

পলিনেট হাউজের পরিচর্যাকারী আবু রায়হান জানান, এখানে মরিচ, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন সবজির চারা পাওয়া যায়। এমনকি ছাদ বাগানের জন্য সবজি ও বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চারাও উৎপাদন করা হয়।

তিনি বলেন, “আমরা চারা তৈরিতে মাটির বদলে কোকোপিট ব্যবহার করি। আধুনিক ট্রে-তে উৎপাদিত এসব চারা শিকড়সহ তোলা যায়, তাই রোপণের পর চারা নষ্ট হয় না বা মারা যায় না। মাটির চারার চেয়ে এর ফলনও অনেক ভালো হয়, যা কৃষককে আর্থিকভাবে লাভবান করে।”

দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন কৃষকরা

পলিনেট হাউজে উৎপাদিত চারার গুণগত মান ভালো হওয়ায় শুধু আক্কেলপুর নয়, পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও কৃষকরা আসছেন চারা সংগ্রহ করতে।

নওগাঁর মথুরাপুর ইউনিয়ন থেকে আসা কৃষক সামছুল হক বলেন, “আগে এখান থেকে চারা নিয়েছিলাম, ফলন খুব ভালো হয়েছে। তাই এবারও এসেছি। ৩০০ পিস ‘গ্রিন বল’ বেগুনের চারা কিনলাম। নিজের জমিতে এগুলো আবাদ করব।”

প্রথমবার চারা নিতে আসা কৃষক খালেক হোসেন বলেন, “আমি ৬ শতক জমিতে মরিচ চাষ করব। তাই প্রথমবারের মতো এখান থেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে ৫০০ পিস চারা নিলাম। যদি ফলন ভালো হয়, তবে ভবিষ্যতে সব চারা এখান থেকেই কিনব।”

কৃষি বিভাগের ভাষ্য ও উদ্দেশ্য

আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রকল্পে দুজন কর্মচারী সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এখানে উন্নতমানের সিজনাল সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। ফলে আশপাশের কৃষকরা সহজেই হাতের কাছে মানসম্মত চারা পাচ্ছেন।

আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, “আধুনিক পলিনেট হাউজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর ভেতরে তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা (Moisture) স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে বাইরের আবহাওয়া খারাপ থাকলেও ভেতরে উচ্চফলনশীল চারা উৎপাদন ব্যাহত হয় না। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং উন্নত চারা সরবরাহের মাধ্যমে তাদের লাভের মুখ দেখানো।”

কৃষি কর্মকর্তারা আশা করছেন, পলিনেট হাউজের এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে জয়পুরহাটের কৃষিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

আরও পড়ুন …


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন