নিজস্ব প্রতিবেদক:
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
কৃষকদের জন্য স্বতন্ত্র পরিচয়পত্র, শস্য বীমা এবং পেনশন ব্যবস্থা চালুর মতো কৃষক-বান্ধব ইস্যুগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
গতকাল (১৮ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা সতর্ক করে বলেন, অপরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকরা এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন।
উন্নয়নের উল্টো পিঠ: উৎপাদন বাড়লেও বাড়ছে মৃত্যু অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বর্তমান কৃষি ও উন্নয়ন মডেলের কড়া সমালোচনা করেন। তার মতে, দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও কৃষকদের দুর্দশা কমেনি, বরং বেড়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুর মিছিল।
আনু মুহাম্মদ বলেন, “গ্রামে ফসলের উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে প্রকৃতি ও মানুষকে। পানি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং খাদ্য বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে ক্যান্সার রোগীদের একটি বড় অংশই কৃষক। উৎপাদন বাড়লেও কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন এবং ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়—এটি বর্তমান উন্নয়ন মডেলের ফলাফল।”
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এই সমস্যাগুলো কেবল কৃষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই গ্রাস করবে। কৃষি এখন আর শুধু খাদ্য উৎপাদনের উৎস নয়—এটি অসুস্থতারও একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নির্মম বাস্তবতাকে অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে।
ইশতেহারে যেসব দাবি চাইলেন বিশেষজ্ঞরা আলোচনা সভায় বক্তারা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কৃষকদের অধিকার রক্ষায় বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন। তারা বলেন, কৃষকদের শুধু ভোটের গুটি হিসেবে ব্যবহার না করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মূল দাবিগুলো হলো:
- স্বতন্ত্র পরিচয় ও নিরাপত্তা: কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বতন্ত্র পরিচয়পত্র এবং বার্ধক্যকালীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা।
- অর্থনৈতিক সুরক্ষা: ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, শস্য বীমা চালু করা এবং সহজ শর্তে সুদমুক্ত কৃষি ঋণ প্রদান।
- পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য: রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো এবং ক্ষতিকর কীটনাশক নিষিদ্ধ করা। একইসঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য ও কৃষি জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।
- সম্পদ রক্ষা: কৃষিজমি সুরক্ষা আইন কার্যকর করা এবং নদী, খাল ও জলাশয়ের দখল ও দূষণ বন্ধ করা।
- জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: দেশীয় শস্যের জাত, মাছ ও গবাদিপশু সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ।
সবুজ বিপ্লব ও গবেষণার গলদ কৃষি গবেষণার গতিপথ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, “সবুজ বিপ্লবের পর কৃষি গবেষণার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল দেশীয় ফসলের জাত, পানিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা। কিন্তু এর পরিবর্তে, গবেষণাগুলো দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির দিকেই বেশি নজর দিয়েছে। ফলে মাটি, পানি এবং মানুষ—সবাই আজ ক্ষতিগ্রস্ত।”
নিরাপদ খাদ্য ও টেকসই কৃষির আহ্বান অনুষ্ঠানের অন্যান্য বক্তারা আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও ঘোষণাপত্রে এই প্রস্তাবনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, একটি নিরাপদ, ন্যায্য, জলবায়ু-সহনশীল এবং সার্বভৌম কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বর্তমানে অন্যতম জরুরি চ্যালেঞ্জ। কৃষকের অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধি এস এম নাজের হোসেন, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) প্রতিনিধি শামসুল হুদা এবং বাংলাদেশ সেফ ফুড অ্যালায়েন্সের কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম বাবু প্রমুখ।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.