স্মার্ট ফার্মিংয়ের যুগেও পুরনো ভুত: কৃষি সংস্কার কমিশন না হওয়ায় হতাশ বিশেষজ্ঞরা

  • সংস্কার সংকট: ১৯৯০ সালের পর গত ৩৫ বছরে কৃষি খাতে কোনো বড় সংস্কার বা রিভিউ হয়নি।
  • কমিশন গঠন: অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন গঠন করলেও কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি।
  • আমদানি নির্ভরতা: ভুট্টার ৯০% ও সবজির ৬০% বীজ আমদানিনির্ভর; গত অর্থবছরে খাদ্যশস্য আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১২.১%।
  • শুল্ক বৈষম্য: তৈরি কীটনাশক আমদানিতে ৫% শুল্ক হলেও দেশীয় উৎপাদনের কাঁচামালে ৫৮% শুল্ক, যা স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বাধা।
  • জমির সংকট: দেশে ৫৬% গ্রামীণ পরিবারের নিজস্ব জমি নেই; প্রতি বছর ০.২% হারে কমছে কৃষিজমি।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যখন ড্রোন, স্মার্ট সেচ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কৃষিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের কৃষি খাত ধুঁকছে ৩৫ বছরের পুরনো সমস্যায়। দেশে প্রতিদিন কমছে কৃষিজমি, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, আর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন কৃষক। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করলেও, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ‘কৃষি’ রয়ে গেছে উপেক্ষিত। ফলে গত সাড়ে তিন দশকে কোনো বড় সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ থেকে কমে ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

সংস্কারহীন ৩৫ বছর ও বর্তমান চিত্র সর্বশেষ ১৯৯০ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে কৃষি খাতে বড় ধরনের সংস্কার ও পর্যালোচনা (রিভিউ) হয়েছিল। সে সময় সেচ, বীজ ও সার ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করায় উৎপাদন ও সারভুক্তি কিছুটা স্বস্তি এনেছিল। কিন্তু এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছরে আর কোনো কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বর্তমানে দেশের কৃষি খাতের চিত্র বেশ নাজুক। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) তথ্যমতে, দেশের ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের নিজস্ব কোনো জমি নেই। ৪০ শতাংশ কৃষক পরিবার ভূমিহীন বর্গাচাষি। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষিজমি উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হচ্ছে না এবং প্রতি বছর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে।

উপেক্ষিত কৃষি সংস্কার কমিশন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করলেও কৃষি খাত বাদ পড়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “১৯৮৮ ও ১৯৯০ সালের পর কৃষিতে অনেক রূপান্তর হয়েছে। পরিবর্তনগুলো ধারণ করার জন্য একটা সংস্কার কমিশন দরকার ছিল। আমরা আশা করেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকার এটি করবে, কিন্তু তা করা হয়নি।” তিনি মনে করেন, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন করে মাঠ পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপক পর্যালোচনা করা।

বাড়ছে আমদানি, কমছে প্রবৃদ্ধি দেশীয় কৃষিতে নীতিসহায়তার অভাবে বাড়ছে আমদানি নির্ভরতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে খাদ্যশস্য আমদানি ব্যয় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ২৩০ কোটি ৬০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ডাল আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, “অন্যান্য খাতের তুলনায় কৃষি খাতকে যতটা গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন ছিল, তা দেওয়া হয়নি। বৈশ্বিক রাজনীতি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। যুদ্ধ বা সংকটের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলো বিপদে পড়বে। তাই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে।”

বীজ ও কীটনাশকে পরনির্ভরশীলতা কৃষির প্রাণ বলা হয় বীজকে, অথচ এর বড় অংশই আমদানিনির্ভর। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ভুট্টার প্রায় ৯০ শতাংশ, পাটের ৭০ শতাংশ এবং সবজির ৬০ শতাংশ বীজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

অন্যদিকে দেশীয় কীটনাশক শিল্পও বৈষম্যমূলক কর নীতির কারণে বিকশিত হতে পারছে না। বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি কৃষিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমদানি করা তৈরি কীটনাশকে শুল্ক মাত্র ৫ শতাংশ, অথচ দেশীয় উৎপাদকদের কাঁচামাল আমদানিতে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। নীতিসহায়তার অভাবে এ শিল্প এগোতে পারেনি, যার খেসারত দিতে হচ্ছে কৃষকদের বেশি দামে কীটনাশক কিনে।”

সার ও আলুর বাজারে অরাজকতা গত মৌসুমে সারের দাবিতে কৃষকদের রাস্তায় নামতে দেখা গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ‘সার সংকট নেই’ বলে দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ে ডিলারদের কারসাজিতে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য হয়েছেন কৃষকরা। একই অবস্থা ছিল আলুর বাজারেও। সরকার আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও হিমাগার গেটে তা বিক্রি হয়েছে ৮ থেকে ১৫ টাকায়। ফলে লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা।

সরকারের বক্তব্য কৃষি খাতকে কম গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ মানতে নারাজ কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। তিনি বলেন, “এ খাতকে কম গুরুত্ব দেয়ার কোনো কারণ দেখছি না। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ২০৫০ সালকে টার্গেট করে আমরা দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান করছি।” সংস্কার কমিশন না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হয়তো সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু কমিশন করেছে, তবে কৃষি মন্ত্রণালয় নিজেদের মতো করে নানা সংস্কার উদ্যোগ নিচ্ছে।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন