কৃষি ব্যাংক ও রাকাব একীভূত করার উদ্যোগ: বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি

  • বড় সিদ্ধান্ত: বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক একীভূত করার লক্ষ্যে ‘কনসেপ্ট পেপার’ তৈরির নির্দেশ।
  • মূলধন সংকট: বিকেবি-এর মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা এবং রাকাব-এর ২ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা।
  • খেলাপি ঋণ: বিকেবি-এর প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং রাকাব-এর ২০ শতাংশ ঋণই খেলাপি।
  • নির্দেশনা: একই গ্রাহক যেন একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে না পারে এবং সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণে জোর দেওয়ার আহ্বান।
  • পরিকল্পনা: খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি বিভাগ শক্তিশালীকরণ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কম সুদে আমানত সংগ্রহের উদ্যোগ।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর লাগামহীন খেলাপি ঋণ, বিশাল অঙ্কের মূলধন ঘাটতি এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানে ব্যর্থতার কারণে বড় ধরণের সংস্কারের পথে হাঁটছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে দেশের অন্যতম বৃহৎ দুই বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)—একীভূত করার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক বিশেষ সভায় এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ধারণাপত্র’ (Concept Paper) তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একীভূতকরণের নেপথ্যে: ভয়াবহ আর্থিক চিত্র সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ব্যাংক দুটির নাজুক আর্থিক পরিস্থিতি উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৯ শতাংশ।

অন্যদিকে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২০ শতাংশই খেলাপি এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তাদের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা

সভার কার্যপত্র থেকে জানা যায়, কৃষি ব্যাংক ও রাকাবের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও জনবান্ধব করতে এই একীভূতকরণ অথবা বিভাগভিত্তিক কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়। ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী সভায় নির্দেশ দেন, এ বিষয়ে দ্রুত একটি ধারণাপত্র প্রস্তুত করতে হবে।

ঋণ বিতরণে ঝুঁকি ও সতর্কতা সভায় কৃষি ও পল্লী ঋণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। দেখা যায়, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক তাদের সংগৃহীত আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়িয়ে ফেলেছে, যা ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। এ বিষয়ে সতর্ক করে ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী সঠিক গ্রাহক নির্বাচন করে নিরাপদ ঋণ বিতরণের ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, “একই গ্রাহক যেন একাধিক ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিতে না পারে, সে জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারে।”

সিএমএসএমই ও কৃষি ঋণে জোর সভায় জানানো হয়, কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণে বিকেবি ও রাকাবের অর্জন সন্তোষজনক হলেও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে রাকাব ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো।

সিএমএসএমই খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “এই খাতের ঋণগ্রহীতারা সাধারণত ইচ্ছাকৃত খেলাপি হন না। তাই বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে এই খাতে ঋণ বিতরণে আরও উদ্যোগী হতে হবে।”

মূলধন ঘাটতি ও ব্যাংকগুলোর আরজি সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে থাকা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের প্রতিনিধিরা সভায় জানান, অতীতে পুনঃতপশিলকৃত ঋণগুলো এখন শ্রেণীকৃত (Classified) ঋণে পরিণত হওয়ায় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে ঘাটতি বেড়েছে। কৃষি ব্যাংক ও রাকাবের কর্মকর্তারা প্রস্তাব দেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যদি কম সুদে প্রকল্প ঋণ বা আমানত পাওয়া যায়, তবে মূলধন পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার নির্দেশ খেলাপি ঋণ আদায়ে ধীরগতি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করা হয় সভায়। বিশেষ করে অবলোপন করা ঋণ (Write-off loans) থেকে নগদ আদায়ের হার এখনো অসন্তোষজনক। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ঋণসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোর আইন বিভাগকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে পৃথক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নিয়মিত তদারকি করা হবে।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন