- সাফল্য: গত চার দশকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কেন্দ্র থেকে আমের ১৪টি নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
- জনপ্রিয় জাত: আম্রপালি, গৌড়মতি, বারি-৪ এবং রপ্তানিযোগ্য রঙিন আম বারি-১৩ দেশজুড়ে সমাদৃত।
- প্রযুক্তি: ড্রোন প্রযুক্তি ও জিএপি (GAP) মান অনুসরণের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- মূল দাবি: জনবলসংকট কাটিয়ে কেন্দ্রটিকে পূর্ণাঙ্গ ‘আম গবেষণা ইনস্টিটিউট’-এ রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রতিনিধি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ:
‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটিতে মধু আছে’—স্থানীয়দের মুখে ফেরা এই কথাটি কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং কৃষি বিজ্ঞানের এক প্রমাণিত সত্য। ফজলি, ক্ষীরসাপাতি, ল্যাংড়া কিংবা আশ্বিনার মতো ঐতিহ্যবাহী আমের সুবাসে আমোদিত এই জনপদ শুধু বাংলাদেশের ‘আমের রাজধানী’ই নয়, বরং দেশের কৃষি অর্থনীতির এক শক্তিশালী স্তম্ভ। এই গৌরবময় ঐতিহ্যের নেপথ্যে গত চার দশক ধরে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র।
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি নানা সীমাবদ্ধতা আর জনবলসংকট নিয়েও আমপ্রেমীদের উপহার দিয়েছে বারি-৪, আম্রপালি, গৌড়মতি ও বারি-১৩-এর মতো জনপ্রিয় সব জাত। দীর্ঘ ৪০ বছরের পথচলায় কেন্দ্রটি এ পর্যন্ত আমের ১৪টি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে, যা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। তবে এত সাফল্যের পরেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো ‘আঞ্চলিক কেন্দ্র’ হিসেবেই রয়ে গেছে। স্থানীয় চাষি, কৃষি উদ্যোক্তা এবং গবেষকদের দীর্ঘদিনের দাবি—দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘আম গবেষণা ইনস্টিটিউট’-এ রূপান্তর করা প্রয়োজন।
চার দশকের পথচলা ও গবেষণার সাফল্য শহর থেকে একটু দূরে প্রায় ৫০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই গবেষণাকেন্দ্রটি যেন এক বিশাল আমবাগান। ভেতরে রয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি, জার্মপ্লাজম সেন্টার বা জেনেটিক ব্যাংক, নার্সারি এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্র।
কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন গবেষণাকেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত আমের মোট ১৮টি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি জাতই উদ্ভাবিত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই কেন্দ্রের গবেষকদের হাতে। এটি নিঃসন্দেহে এক বিশাল অর্জন। বিশেষ করে বাংলাদেশে সংকরায়ণ বা হাইব্রিডাইজেশন পদ্ধতির মাধ্যমে উদ্ভাবিত চারটি নতুন জাতই এসেছে এই কেন্দ্রের হাত ধরে।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন প্রতিষ্ঠানের সাফল্য তুলে ধরে বলেন, “প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই আমরা জনবলসংকট নিয়ে চলছি। কিন্তু গবেষণায় আমরা কখনো পিছিয়ে থাকিনি। নির্বাচন (Selection) ও প্রবর্তন (Introduction) পদ্ধতির মধ্য দিয়ে উদ্ভাবিত আম্রপালি ও গৌড়মতি আম দুটি এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আমের অর্থনীতিতে এই জাতগুলো শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে।”
নতুন জাতে নতুন দিন: ফলন বেড়েছে ৩০ শতাংশ ঐতিহ্যবাহী আমের জাতগুলোর পাশাপাশি গবেষণাকেন্দ্রের উদ্ভাবিত নতুন জাতগুলো চাষিদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে বারি-৪ এবং বারি-১৩ জাতের আম এখন কৃষকদের পছন্দের শীর্ষে।
গবেষকরা জানান, বারি-১৩ একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় রঙিন জাতের আম। এটি মৌসুমের শেষ দিকে পাকে বলে বাজারে এর চাহিদা ও দাম—উভয়ই বেশি থাকে। এছাড়া এর ত্বক শক্ত ও মসৃণ হওয়ায় এটি রপ্তানির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অন্যদিকে বারি-৪ জাতটি উচ্চ ফলনশীল এবং খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু।
গবেষণায় দেখা গেছে, সনাতন জাতের তুলনায় এই নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর ফলন গড়ে ২৫-৩০ শতাংশ বেশি। এগুলো রোগপ্রতিরোধী এবং তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণযোগ্য হওয়ায় চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। আগে যেখানে আমের মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হতো, এখন নাবি জাত (Late Variety) চাষ করে কৃষকরা সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে এনেছেন।
আধুনিক প্রযুক্তিতে কৃষকের দিনবদল গবেষণাকেন্দ্রটি কেবল ল্যাবেই সীমাবদ্ধ নেই, তারা ল্যাব থেকে লব্ধ জ্ঞান মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কৃষকদের শেখানো হচ্ছে ‘গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস’ বা জিএপি (GAP) পদ্ধতি।
আমচাষি রফিকুল ইসলাম নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “আগে আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে যেভাবে চাষ করতাম, সেভাবেই করতাম। বছরে একবার ফলন হতো, তাও পোকা-মাকড়ে নষ্ট হতো। এখন বিজ্ঞানীদের পরামর্শে আমগাছের ছাঁটাই (Pruning), সুষম সার ব্যবস্থাপনা, রোগ দমন এবং ফল সংগ্রহের আধুনিক নিয়ম মানছি। এতে আমার বাগানের ফলন আগের চেয়ে দেড় গুণ বেড়েছে। রোগবালাইও এখন অনেক কম।”
কেন্দ্রটি কৃষকদের পরিবেশবান্ধব বালাইনাশক ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। বিষাক্ত কীটনাশকের বদলে ফেরোমেন ফাঁদ, বায়োপেস্টিসাইড এবং ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহার এখন গ্রামজুড়ে জনপ্রিয়। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে।
রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন স্বপ্ন একসময় দেশের আম বিদেশে রপ্তানি করা ছিল স্বপ্নবিলাস। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে এই কেন্দ্রের হাত ধরে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আমকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলাই এখন গবেষকদের লক্ষ্য। রপ্তানিযোগ্য আমের গ্রেডিং, প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ বা ঠান্ডা সংরক্ষণ এবং শতভাগ কীটনাশকমুক্ত উৎপাদন—এসব ক্ষেত্রেও চলছে নিবিড় গবেষণা।
গবেষণাকেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আম চাষাবাদকে আরও স্মার্ট করতে তারা ‘ড্রোনভিত্তিক আমবাগান পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি’ চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। এছাড়া আমের জেনেটিক রিসোর্স ব্যাংক এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজও প্রক্রিয়াধীন, যা দেশের আমশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে।
সংকট ও ইনস্টিটিউট করার দাবি বিশ্বে বাংলাদেশ বর্তমানে সপ্তম বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী দেশ। আর এই বিপুল উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশই আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে। অথচ আম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো গবেষণা ইনস্টিটিউট না থাকায় হতাশ স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তারা।
কৃষি অ্যাসোসিয়েশন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট কৃষি উদ্যোক্তা মুনজের আলম এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “দেশে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট আছে, মসলা গবেষণা ইনস্টিটিউট আছে। অথচ আমের মতো এত বড় একটি অর্থকরী ফসল, যার অর্থনৈতিক পরিধি মসলা বা ইক্ষুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, তার জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউট নেই। ১৯৮৫ সালে এটি ‘আম গবেষণা কেন্দ্র’ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পাঁচ বছর পর সেটিকে ‘আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্র’ করা হয়, যা এক ধরণের অবনমন।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “বর্তমানে এই কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় গবেষণা উপকরণ, আধুনিক ল্যাব সুবিধা ও পর্যাপ্ত গবেষক নেই। একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রের বরাদ্দ ও ক্ষমতা সীমিত থাকে, যা আমের মতো বিশাল খাতের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত নয়।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কেন্দ্রটিকে পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করা হলে এখানে আরও উন্নতমানের গবেষণা সম্ভব হবে। জনবল সংকট কাটবে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা সহজ হবে।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশিষ কুমার রায় বলেন, “দেশের আমের সূতিকাগার হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নিবিড় গবেষণা নিশ্চিত হবে। নিরাপদ ও লাভজনক উপায়ে মানসম্পন্ন আমের উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি আম প্রক্রিয়াজাতকরণ (Processing) ও বাজারজাতকরণ বিষয়ক গবেষণাও জোরদার হবে, যা সারা বছর আমের প্রাপ্যতা ও কৃষকের আয় নিশ্চিত করবে।”
আম কেবল একটি ফল নয়, এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। চার দশকের গবেষণায় যে সাফল্য এসেছে, তাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এখন দেখার বিষয়, নীতিনির্ধারকরা কৃষকদের এই প্রাণের দাবি কবে পূরণ করেন।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.