বাংলাদেশে দেদারসে চলছে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ ১৭ কীটনাশক: বাড়ছে ক্যানসার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ইউরোপসহ বিশ্বের বহু দেশে নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশে দেদারসে ব্যবহার হচ্ছে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত অন্তত ১৭টি কীটনাশক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কর্তৃক ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকাভুক্ত এসব রাসায়নিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।

গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির অর্থায়নে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এই ভীতিজাগানিয়া তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে এমন ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিবন্ধিত রয়েছে, যার মধ্যে ১৭টির ব্যাপক ব্যবহার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন।

যেসব বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার হচ্ছে

গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ গোপাল দাস গনমাধ্যমকে জানান, মানুষ বা পরিবেশের গুরুতর বা স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে এমন কীটনাশককেই ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলা হয়।

গবেষণায় চিহ্নিত দেশে বহুল ব্যবহৃত ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক হলো—প্যারাকোয়াট, গ্লাইফোসেট, ক্লোরপাইরিফস, অ্যাবামেকটিন, অ্যাসিটোক্লোর, জিঙ্ক ফসফাইড, ব্রোমাডিওলোন, কার্বেনডাজিম এবং প্রোপিকোনাজোল। এর মধ্যে প্যারাকোয়াট ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশসহ বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশে এটি কৃষকরা অহরহ ব্যবহার করছেন।

এছাড়া ক্যাডুসাফস, থিয়াক্লোপ্রিড ও স্পিরোডিক্লোফেনসহ আরও সাতটি উপাদান মাঝারি মাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব উপাদানের মধ্যে কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক এবং ইঁদুরনাশক রয়েছে।

সবজিতে বিষের ভয়াবহ মাত্রা

২০২৩ সালের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৭৭ শতাংশ কৃষক সবজিতে কীটনাশক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশই কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া বিষ ছিটান। শঙ্কার বিষয় হলো, কোনো কোনো ফসলের পুরো মৌসুমে ১৭ থেকে ১৫০ বার পর্যন্ত কীটনাশক স্প্রে করা হয়।

বাকৃবি ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের যৌথ পরীক্ষায় দেখা গেছে:

  • ১,৫৭৭টি শীতকালীন সবজির নমুনার মধ্যে ৩০ শতাংশে কীটনাশকের উপস্থিতি মিলেছে।
  • ৭৩ শতাংশ নমুনায় এর মাত্রা ছিল নিরাপদ সীমার (কেজিতে ০.০৫ মিলিগ্রাম) ওপরে।
  • লাউয়ের শতভাগ, শিমের ৯২ শতাংশ, টমেটোর ৭৮ শতাংশ এবং বেগুনের ৭৩ শতাংশ নমুনায় কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

ক্যানসারের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ক্যানসার, লিভার ও স্নায়ুবিক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি একদল হেমাটোলজিস্টের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ সালে ঢাকার সাতটি ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪৩০ জন রোগীর মধ্যে অন্তত ১৫০ জনই ফসলের মাঠে সরাসরি কীটনাশক ব্যবহার করতেন।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাত বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে কীটনাশকযুক্ত খাবার খেলে ক্যানসার, স্নায়ুবিক সমস্যা ও লিভারের রোগ হতে পারে।”

কিশোরগঞ্জের কৃষক মো. মোক্তার উদ্দিন (৬৫) জানান, তিনি সুরক্ষা হিসেবে শুধু মুখে কাপড় পেঁচিয়ে স্প্রে করতেন। বর্তমানে তিনি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন।

নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ও কর্তৃপক্ষের ভাষ্য

বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিপিএ) তথ্যমতে, ২০১০ সালে দেশে কীটনাশক কোম্পানি ছিল ১২৪টি, যা এখন বেড়ে ৯০০-তে দাঁড়িয়েছে। গত বছর কৃষকরা ৪০ হাজার ৮৩২ টন কীটনাশক ব্যবহার করেছেন।

উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের উপপরিচালক (কীটনাশক) মুহাম্মদ শাহ আলম জানান, গত ডিসেম্বর থেকে প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেটযুক্ত নতুন পণ্যের নিবন্ধন বন্ধ করা হয়েছে। তবে বাজারে বিদ্যমান ১৮৭টি পণ্য এবং বিপজ্জনক কীটনাশকগুলো নিষিদ্ধ করা হবে কি না, তা কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

অধ্যাপক গোপাল দাস সতর্ক করে গনমাধ্যমকে বলেন, “কোম্পানির সংখ্যা যত বাড়বে, নিয়ন্ত্রণ তত কঠিন হবে। সরকার এক রাতে সব নিষিদ্ধ করতে পারবে না, তবে বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। অন্যথায় খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব পড়বে।” তিনি মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার এবং কৃষকদের নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন