বাংলাদেশে হাই-টেক গ্রিনহাউস: প্রয়োজন নাকি বিলাসিতা?

কৃষি ও অর্থনীতি ডেস্ক:

ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষিকাজে ‘হাই-টেক গ্রিনহাউস’ অপরিহার্য হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি কতটা কার্যকর? উপ-ক্রান্তীয় জলবায়ুর দেশ বাংলাদেশে যেখানে প্রাকৃতিক আলো ও তাপমাত্রা ফসলের জন্য আশীর্বাদ, সেখানে পশ্চিমা প্রযুক্তির অন্ধ অনুকরণ কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বাণিজ্যিক কৃষি সম্প্রসারণে ব্যয়বহুল হাই-টেক গ্রিনহাউসের চেয়ে কম খরচের স্থানীয় প্রযুক্তি বা ‘লো-কস্ট প্রোটেক্টেড এগ্রিকালচার’ অনেক বেশি টেকসই ও লাভজনক।

প্রাকৃতিক সুবিধাই আমাদের প্রধান সম্পদ

ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে সূর্যালোকের অভাব এবং দীর্ঘ শীতের কারণে গ্রিনহাউস অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবেই উর্বর। এখানে উচ্চ তাপমাত্রা ও পর্যাপ্ত সূর্যালোক খোলা মাঠে সারা বছর ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে। এমনকি শীতকালের হালকা ঠান্ডা অনেক ফসলের মিষ্টতা ও রঙ বৃদ্ধিতে সহায়ক। তাই আবহাওয়ার দোহাই দিয়ে এদেশে উচ্চ প্রযুক্তির গ্রিনহাউস স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে।

বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির বিনিয়োগ

হাই-টেক গ্রিনহাউসের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুতের বিভ্রাট একটি সাধারণ ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রিনহাউসের কুলিং সিস্টেম বন্ধ হলে ভেতরে তাপমাত্রা দ্রুত ৪০–৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যায়। এতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো ফসল ঝলসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা একজন বাণিজ্যিক উদ্যোক্তার পুরো বিনিয়োগকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

উপকরণ সংকট ও উচ্চ খরচ

গ্রিনহাউস বা হাইড্রোপনিক্স সফল করতে উচ্চমানের নিউট্রিয়েন্ট সল্ট, ফুড-গ্রেড প্লাস্টিক সিস্টেম এবং বালাই ব্যবস্থাপনার যেসব উপকরণ প্রয়োজন, তা বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। এগুলো আমদানি করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়ে যায় যে, সাধারণ বাজারে কৃষকের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রধান শত্রু আবহাওয়া নয়, পোকামাকড়

বাংলাদেশের কৃষিতে ফলন হ্রাসের প্রধান কারণ তাপমাত্রা নয়, বরং পোকামাকড়ের আক্রমণ (Insect Pest Pressure)। গবেষণায় দেখা গেছে, হাই-টেক গ্রিনহাউস নয়, বরং যথাযথ বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM), ফেরোমোন ফাঁদ এবং নেট হাউসের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে উন্মুক্ত মাঠেই ৩০–৫০ শতাংশ ফলন বাড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ, এখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে পোকা দমনই মুখ্য চ্যালেঞ্জ।

বাস্তবতা ও টেকসই সমাধান

বাংলাদেশের জন্য আদর্শ সমাধান হিসেবে কৃষিবিদরা ‘লো-কস্ট প্রোটেক্টেড এগ্রিকালচার’-এর ওপর জোর দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে:

  • পোকামাকড় রোধী নেট হাউস (Insect-proof net house)
  • প্লাস্টিক রেইন শেল্টার (Plastic rain shelter)
  • ছায়া প্রদানকারী কাঠামো (Shade structure)

এই প্রযুক্তিগুলোতে বিনিয়োগ কম, বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা নেই এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহজ। এতে সামান্য পরিবেশ নিয়ন্ত্রণেই ফলন ২০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব, যা বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতপক্ষেই ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট’ কৃষি।

নীতিনির্ধারকদের করণীয়

কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়নে নীতিনির্ধারকদের প্রতি চারটি সুপারিশ উঠে এসেছে এই বিশ্লেষণে:

  • লো-কস্ট প্রযুক্তিতে জোর: হাই-টেক গ্রিনহাউসের পরিবর্তে কম খরচের নেট হাউস ও রেইন শেল্টার প্রযুক্তিকে মূলধারায় নিয়ে আসা।
  • আইপিএম উপকরণ সহজলভ্য করা: বায়ো-পেস্টিসাইড, ফেরোমোন ফাঁদ ও পরজীবী পোকা দমনে বিনিয়োগ বাড়ানো।
  • হাইড্রোপনিক্স হোক ছাদভিত্তিক: হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিকে ব্যাপকভিত্তিক সবজি উৎপাদনের পরিবর্তে ছাদ কৃষি এবং প্রিমিয়াম মার্কেটের (লেটুস, স্ট্রবেরি ইত্যাদি) জন্য সীমাবদ্ধ রাখা।
  • গবেষণা ও সংযোগ: বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেসরকারি খাতের সংযোগ ঘটিয়ে দেশীয় উপযোগী মডেল তৈরি করা।

বাংলাদেশের কৃষি বাস্তবতায় হাই-টেক গ্রিনহাউস অনেকটা ‘লাক্সারি টেকনোলজি’ বা বিলাসিতা। দেশের বৃহৎ কৃষি অর্থনীতির জন্য এটি লাগসই নয়। বরং পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণভিত্তিক স্বল্প খরচের প্রযুক্তিই হতে পারে ফলন বৃদ্ধি ও কৃষকের মুনাফা নিশ্চিত করার বাস্তবসম্মত পথ।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন