নিজস্ব প্রতিবেদক:
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকদের চাষযোগ্য জমি দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছিল।
সামনে বোরো মৌসুম, কিন্তু সেচ সংকট, তীব্র খরা ও মাটিতে বেড়ে যাওয়া লবণাক্ততা কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। তবে এই চরম সংকটের মধ্যেই আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভাবিত কয়েকটি লবণ সহনশীল ধানের জাত।
বিশেষ করে ‘বিনা ধান-১০’ এখন উপকূলীয় কৃষকদের কাছে এক নতুন সম্ভাবনার নাম। সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও দেবহাটার মতো লবণাক্ত জনপদে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই ধান।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই জাতগুলোই আগামী দিনে উপকূলীয় কৃষির মেরুদণ্ড হয়ে উঠবে।
লবণাক্ততা জয়ে ‘বিনা ধান-১০’ এর সাফল্য
উপকূলীয় অঞ্চলে বোরো মৌসুমে যে কয়েকটি ধান ভালো ফলন দেয়, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ‘বিনা ধান-১০’। এটি একটি উচ্চ ফলনশীল ও আগাম বোরো জাত।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) সাতক্ষীরা উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মিলন কবীর গনমাধ্যমকে জানান, সাধারণ ধানের তুলনায় বিনা ধান-১০ প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন আগে কাটা যায়। এর জীবনকাল মাত্র ১২৫-১৩০ দিন। ফলে মৌসুমের শেষদিকে যখন মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা তীব্র হয়, তার আগেই কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারেন।
বিনা ধান-১০ এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য:
- লবণ সহনশীলতা: চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএস/মিটার এবং পাকার সময় ১০-১২ ডিএস/মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
- ফলন: লবণাক্ত জমিতে হেক্টরে গড়ে ৫.৫ টন এবং স্বাভাবিক জমিতে ৮.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
- উপযোগিতা: সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও দেবহাটার মতো তীব্র লবণাক্ত এলাকার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
নতুন সম্ভাবনায় অন্য জাতগুলো
শুধু বিনা ধান-১০ নয়, উপকূলের মাটির ধরণ অনুযায়ী আরও কয়েকটি জাত কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে:
- বিনা ধান-২৫: এটি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির সরু ও সুগন্ধি চাল। কলারোয়া ও তালা উপজেলার স্বাভাবিক জমিতে এটি হেক্টরে ৭.৬ টন ফলন দিচ্ছে। এটি রোগবালাই ও লবণ সহনশীল হওয়ায় বাড়তি সারের প্রয়োজন হয় না।
- বিনা ধান-১৭: এটিও উচ্চ ফলনশীল এবং স্বল্পমেয়াদী। এই জাতে সারের ব্যবহার কম লাগে এবং প্রতি গাছে শীষের পরিমাণ বেশি হয়।
- বিনা ধান-২৩ ও ১৯: জলাবদ্ধতা ও খরাপ্রবণ এলাকার জন্য এই দুটি জাত আশীর্বাদস্বরূপ। বিনা ধান-২৩ দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এবং বিনা ধান-১৯ খরা মোকাবিলায় সক্ষম।
এছাড়া বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত ব্রি ধান-৬৭, ৯৭ ও ৯৯ জাতগুলোও লবণাক্ত এলাকায় সফলভাবে চাষ হচ্ছে। ব্রি ধান-৬৭ প্রচলিত ব্রি ধান-২৮ এর চেয়ে অনেক বেশি লবণ সহনশীল এবং জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিন।
উপকূলের নির্মম বাস্তবতা ও সেচ সংকট
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, উপকূলে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা ১৫ থেকে ২৫.৪ ডেসিসিমেন্স/মিটার (dS/m) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ২০২৫ সালের এক তথ্য অনুযায়ী নদীর পানিতে লবণাক্ততা ৪০ dS/m পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা গনমাধ্যমকে বলেন, “এ অঞ্চলের চাষ পুরোপুরি সেচনির্ভর। ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হওয়ায় সেচের পানি না থাকলে বিশাল অঙ্কের জমি পতিত পড়ে থাকে।”
কৃষকরা জানান, তাদের একমাত্র ভরসা পুকুর ও খালের সংরক্ষিত মিষ্টি পানি। তবে অনেক জায়গায় পুকুর ভরাট ও অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের কারণে মিষ্টি পানির আধার নষ্ট হচ্ছে।
কমছে বোরো আবাদ, বাড়ছে প্রযুক্তি নির্ভরতা
সেচ ও লবণাক্ততার সংকটে সাতক্ষীরায় এবার বোরো আবাদ কমেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে, এবার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর, যা গত আমন মৌসুমের তুলনায় ৮ হাজার ৩৪৫ হেক্টর কম। বিশেষ করে শ্যামনগর ও কালিগঞ্জে এই হ্রাসের হার আশঙ্কাজনক।
তবে আশার কথা শোনালেন সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম। তিনি গনমাধ্যমকে বলেন, “কৃষকরা এখন আর আগের মতো ক্ষতির ভয়ে চাষ থেকে বিরত থাকছেন না। বিনা ও ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলো টিকে থাকার পাশাপাশি ভালো ফলন দিচ্ছে। আগামী মৌসুমে এসব সহনশীল জাতের চাষ অন্তত ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশা করছি।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
কৃষি বিশেষজ্ঞরা উপকূলীয় কৃষিকে বাঁচাতে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:
১. জাত নির্বাচন: আগাম ও লবণসহিষ্ণু জাত (যেমন বিনা-১০, ব্রি-৬৭) নির্বাচন করা।
২. সেচ ব্যবস্থাপনা: জমির পাশে ছোট ‘মিনি পুকুর’ খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং খালগুলো মিষ্টি পানির আধারে পরিণত করা।
৩. বিকল্প ফসল: ধানের পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদী ‘বিনা সরিষা-৯’ চাষ করা, যা মাত্র ৪৫-৬৫ দিনে ফলন দেয়।
বিএডিসি সাতক্ষীরা কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. ইবনে সিনা গনমাধ্যমকে জানান, সেচ সুবিধার জন্য তারা খাল খনন ও মিষ্টি পানি পরিবহনের প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, যা কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে সহায়তা করবে।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.