অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে দেশের অনেক অঞ্চলের মাটির উর্বরতা শক্তি কমছে এবং বাড়ছে অম্লতা বা এসিডিটি। মাটির এই ‘অসুখ’ সারাতে এবং ফসলের কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে কৃষিবিজ্ঞানীরা ডলোচুন ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। সঠিক নিয়মে ডলোচুন ব্যবহারে ফসলের ফলন ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
আসুন জেনে নিই, ডলোচুন কী, কেন ব্যবহার করবেন এবং এর সঠিক প্রয়োগ পদ্ধতি।
ডলোচুন কী ও কেন জরুরি?
ডলোচুন হলো এক ধরনের সাদা পাউডার জাতীয় দ্রব্য, যা ডলোঅক্সিচুন বা ডলোমাইট পাউডার নামেও পরিচিত। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে।
মাটির স্বাস্থ্য বা পিএইচ (pH) মান ৭-এর নিচে নেমে গেলে মাটি অম্লীয় হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পিএইচ মান ৫.৫-এর নিচে গেলে তা তীব্র অম্লীয় মাটি হিসেবে গণ্য হয়। বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল এবং টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকার মাটিতে এই সমস্যা প্রকট। তীব্র অম্লীয় মাটির বিষক্রিয়া কাটাতে এবং মাটির স্বাস্থ্য ফেরাতে ডলোচুন বা ডলোমাইট অত্যন্ত কার্যকর।
প্রয়োগের সঠিক মাত্রা
অধিক অম্লীয় মাটিতে ডলোচুন ব্যবহারের সুপারিশকৃত মাত্রা হলো:
- প্রতি শতাংশে: ৪ কেজি
- প্রতি একরে: ৪০০ কেজি
- প্রতি হেক্টরে: ১০০০ কেজি
- মনে রাখবেন, কোনো জমিতে একবার ডলোচুন প্রয়োগ করলে পরবর্তী তিন বছর আর ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।
ছিটানোর নিয়ম ও সময়
বছরের যেকোনো সময় ডলোচুন ব্যবহার করা গেলেও আমন ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে বা রবি মৌসুমে এটি প্রয়োগের উত্তম সময়।
পদ্ধতি: ১. মোট ডলোচুনকে সমান দুই ভাগে ভাগ করে নিতে হবে। ২. মাটির ‘জো’ থাকা অবস্থায় অর্ধেক পরিমাণ ডলোচুন উত্তর-দক্ষিণ বরাবর এবং বাকি অর্ধেক পূর্ব-পশ্চিম বরাবর আড়াআড়িভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। ৩. ছিটানোর পরপরই আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ৪. যদি মাটিতে রস কম থাকে, তবে ছিটানোর পর চাষ দিয়ে হালকা সেচ দিতে হবে।
বীজ বপনে সতর্কতা
ডলোচুন প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গেই বীজ বপন বা চারা রোপণ করা যাবে না। এতে বীজের অঙ্কুরোদগম ব্যাহত হতে পারে। ডলোচুন মিশানোর কমপক্ষে ১২-১৪ দিন পর জমিতে প্রয়োজনীয় চাষ ও মই দিয়ে ফসল বুনতে বা গাছ রোপণ করতে হবে।
ব্যবহারের সুবিধা
- গম, ভুট্টা, আলু, সরিষা, ডাল, মসলা ও সবজি জাতীয় ফসলের ফলন ১০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
- ডলোচুন ব্যবহার করলে জমিতে আলাদা করে ম্যাগনেসিয়াম সার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
- আলুর স্কেব রোগ এবং পাটের কালো পট্টি রোগ কমে যায়।
- সবজির রঙ উজ্জ্বল হয় এবং ফসলের বৃদ্ধি সমানভাবে হয়।
সতর্কতা
- জমিতে ফসল থাকা অবস্থায় ডলোচুন প্রয়োগ করা যাবে না।
- খুব বেশি বাতাসের সময় বা কাদা জমিতে এটি ছিটানো উচিত নয়।
- সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি ব্যবহার করা যাবে না।
বিশেষ টিপস:
রবি ফসলের (গম, আলু, ভুট্টা, সরিষা, পিঁয়াজ) ক্ষেত্রে জমি প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রতি শতাংশে ১২ থেকে ১৬ কেজি জৈব সার (গোবর বা কম্পোস্ট) মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে আরও ভালো ফলন পাওয়া যায়।
আর পড়ুন
- গাছের জন্য ৮ সহজ জৈব সার: ঘরেই বানিয়ে নিন সেরা পুষ্টি
- ধান চাষে কৃষকের সহায়তায় ব্রি’র ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.