কৃষির আধুনিকায়নে আসছে ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা, চূড়ান্ত খসড়া ডিসেম্বরে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:

দেশের কৃষিকে দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক, টেকসই ও লাভজনক করতে ২৫ বছরের একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকার। ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা ও প্রযুক্তির অগ্রগতিকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি এই পরিকল্পনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী ডিসেম্বরেই এর চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত হবে।

বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব তথ্য জানান কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

পরিকল্পনায় যা থাকছে

কৃষি সচিব জানান, ১৩টি মূল খাত এবং এর অধীন অসংখ্য উপখাতকে সামনে রেখে এই মহাপরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৭টি সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা ২৫ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে কয়েকটি পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পও নেওয়া হবে, যা বিশদ গবেষণার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।

সার ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার

সচিব বলেন, “সার ব্যবস্থাপনায় আমরা এমন একটি নীতি প্রণয়ন করছি, যাতে প্রতি বছর দুই-তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। চলতি বছর এরই মধ্যে এক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।”

কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সবজির দাম কেজি ১০০ টাকা হলে কেউ কথা বলেন না, কিন্তু পেঁয়াজের দাম ১০০ হলেই আলোচনার ঝড় ওঠে। কৃষক কি ন্যায্য দাম পাবেন না?” তিনি আগামী তিন বছরের মধ্যে আদা ও পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যের কথাও জানান।

কৃষিযন্ত্রে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ও চ্যালেঞ্জ

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) যান্ত্রিক ধান চাষাবাদ প্রকল্পের পরিচালক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র তৈরির পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম তৈরি করছে ব্রি। শ্রীলঙ্কা ও জাপানের সহায়তায় দেশেই এখন মানসম্পন্ন কৃষিযন্ত্র তৈরি হচ্ছে।

তবে কৃষিযন্ত্র উৎপাদনে বেশ কিছু বাধার কথাও উঠে আসে। ব্রি-এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দুরুল হুদা বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও দেশে ইঞ্জিন তৈরির মতো রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান দাঁড়াতে পারেনি। হালকা প্রকৌশল খাতের অদক্ষতা ও সিএনসি-ভিত্তিক প্রযুক্তির অভাবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক মানের কম্বাইন হারভেস্টার তৈরি করতে পারছেন না।”

কৃষিকে লাভজনক পেশায় রূপান্তর

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, “কৃষিকে কেবল উৎপাদনের খাত হিসেবে দেখলে হবে না; একে লাভজনক, সম্মানজনক ও শিক্ষিত পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।” তিনি জানান, দেশের কৃষি অর্থায়নের প্রায় ৮৫ শতাংশই ক্ষুদ্র ঋণ (এমএফআই) খাতের মাধ্যমে হচ্ছে।

রপ্তানিতে বিপুল সম্ভাবনা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “বিশ্ববাজারে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের আকার চার ট্রিলিয়ন ডলার, অথচ আমাদের অংশগ্রহণ মাত্র এক বিলিয়ন ডলার। রপ্তানির ক্ষেত্রে ১৮টি দপ্তর থেকে অনুমতি নিতে হয়, যা সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। এ জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে গ্রাম পর্যায় থেকেই কাজ করতে হবে এবং বিএসটিআইয়ের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।

উৎপাদনে বিপ্লব

ব্রি মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান জানান, স্বাধীনতার পর প্রতি হেক্টরে ধান উৎপাদন ছিল দেড়-দুই টন, যা এখন অনেক জায়গায় ১০ টন ছাড়িয়েছে। হাইব্রিড জাত ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে ভবিষ্যতে গড় ফলন ১০ টনের ওপরে নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন