কৃষিতে খেলাপি ঋণের রেকর্ড: অংক ছাড়াল ২০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের যে দীর্ঘস্থায়ী সংকট, তার কালো ছায়া এবার জেঁকে বসেছে কৃষিঋণেও। সাধারণত ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত কৃষি খাতে হঠাৎ করেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে কৃষিঋণে খেলাপি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৩০২ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত কৃষিঋণের প্রায় ৩৪ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মার্চ মাসে কৃষি খাতে খেলাপি ছিল ৯ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। অথচ অক্টোবরে এসে তা লাফিয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের জুনেও এই অংক ছিল মাত্র ৫ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।

নীতিমালার ফেরে বাড়ল খেলাপি

হঠাৎ এই উল্লম্ফনের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ঋণ শ্রেণিকরণের নতুন নীতিমালাকে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের মান নির্ণয়ের সময়সীমা কমিয়ে এনেছে।

  • আগের নিয়ম: কৃষিঋণ ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড’ হতে সময় লাগত ১ বছর, ‘ডাউটফুল’ হতে ৩ বছর এবং ‘ব্যাড লোন’ বা মন্দ ঋণ হতে লাগত ৫ বছর।
  • নতুন নিয়ম: এই সময়সীমা কমিয়ে যথাক্রমে ৩ মাস, ৬ মাস ও ১২ মাস করা হয়েছে।

ফলে আগে যেসব ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো, নতুন নিয়মে সেগুলো দ্রুত খেলাপির তালিকায় চলে এসেছে। বর্তমানে দেশে বিতরণকৃত কৃষিঋণের স্থিতি ৫৯ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশই এখন খেলাপি।

সরকারি ব্যাংকেই সব দায়

কৃষিঋণে খেলাপির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।

  • সরকারি ব্যাংক: ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কৃষিঋণ স্থিতি ৩৯ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ১৮ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা (৪৬.৯৩%)।
  • বেসরকারি ব্যাংক: কৃষি খাতে ঋণ দিয়েছে ১৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। খেলাপি ১ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা (৮.১৬%)।
  • বিদেশি ব্যাংক: ঋণ বিতরণ ৯৭০ কোটি টাকা, তবে এদের কোনো খেলাপি ঋণ নেই।

শীর্ষে কৃষি ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক

টাকার অংকে খেলাপি ঋণে সবার ওপরে রয়েছে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। তবে শতাংশের হিসেবে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে শরীয়াহ ভিত্তিক ইউনিয়ন ব্যাংক।

টাকার অংকে শীর্ষ ৫ খেলাপি ব্যাংক: ১. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক: মোট ঋণ ২১,৬৯১ কোটি টাকা; খেলাপি ১২,৮৯১ কোটি টাকা। ২. সোনালী ব্যাংক: মোট ঋণ ৯,১২৮ কোটি টাকা; খেলাপি ৩,৩৬২ কোটি টাকা। ৩. রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব): মোট ঋণ ২,৪৫১ কোটি টাকা; খেলাপি ১,০১১ কোটি টাকা। ৪. জনতা ব্যাংক: মোট ঋণ ৩,১০৯ কোটি টাকা; খেলাপি ৭১৬ কোটি টাকা। ৫. অগ্রণী ব্যাংক: মোট ঋণ ২,৯০৬ কোটি টাকা; খেলাপি ৫৩০ কোটি টাকা।

শতাংশের হিসেবে শীর্ষ ৫ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক: ১. ইউনিয়ন ব্যাংক: ৯০.২৪% ঋণই খেলাপি। ২. ন্যাশনাল ব্যাংক: ৬৪.৬৭%। ৩. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক: ৫৯.৪৪%। ৪. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক: ৫৫.২২%। ৫. এবি ব্যাংক: ৫৫.১৩%।

খাতভিত্তিক ঋণ চিত্র

চলতি অর্থবছরে ব্যাংকগুলো বিভিন্ন কৃষি খাতে যে ঋণ বিতরণ করেছে তার চিত্র নিম্নরূপ:

  • শস্য উৎপাদন: ৫ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা।
  • প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি: ৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।
  • মৎস্য খাত: ১ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা।
  • দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম: ৫২২ কোটি টাকা।
  • কৃষিযন্ত্র ক্রয়: ৬০ কোটি টাকা।
  • সেচযন্ত্র ক্রয়: ৪৮ কোটি টাকা।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

হঠাৎ খেলাপি বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী গনমাধ্যমকে বলেন, “আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যেতে গিয়েই সময়সীমায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে খেলাপি বেড়েছে। তবে খুব দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।”

অন্যদিকে, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি সতর্ক করে গনমাধ্যমকে বলেন, “কৃষিখাতে খেলাপি বেড়ে গেলে উৎপাদন, রপ্তানি, এমনকি দেশজুড়ে মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি হবে। খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এই খাতকে আরও বেশি নীতি সহায়তায় আনতে হবে।” তিনি কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিশেষ ঋণ স্কিমের সুপারিশ করেন।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন