শীতের আমেজে ‘মৃত্যুফাঁদ’: কাঁচা খেজুরের রসে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি, সতর্কতা জরুরি

লাইফস্টাইল ডেস্ক:

শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে এক ভিন্ন আমেজ তৈরি হয়। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে খেজুরের রস খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেজুরের রসের স্বাদ আরও মিষ্টি ও লোভনীয় হয়ে ওঠে। তবে এই অমৃতসম রসের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে মরণঘাতী বিপদ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কাঁচা খেজুরের রস পান করার মাধ্যমে ‘নিপাহ ভাইরাস’ সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে।

শীতের এই মৌসুমে রসনা তৃপ্ত করতে গিয়ে যাতে কেউ জীবনঝুঁকিতে না পড়েন, সেজন্য নিপাহ ভাইরাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানা ও সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।

নিপাহ ভাইরাস কী?

নিপাহ একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। এটি মূলত একটি ‘জুনোটিক ভাইরাস’, অর্থাৎ এটি পশু-পাখি থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়। বাংলাদেশে এই ভাইরাসের প্রধান উৎস হলো বাদুড়।

শীতকালে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য যে হাঁড়ি পাতা হয়, রাতে বাদুড় সেই রস পান করতে আসে। এ সময় বাদুড় রসের হাঁড়িতে মুখ দেয় অথবা তার লালা ও মলমূত্র রসের সঙ্গে মিশে যায়। ওই দূষিত কাঁচা রস মানুষ পান করলে নিপাহ ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে।

সংক্রমণ যেভাবে ছড়ায়

বাংলাদেশে সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। এটি ছড়ানোর প্রধান মাধ্যমগুলো হলো:

  • বাদুড় থেকে মানুষে: দূষিত কাঁচা খেজুরের রস বা বাদুড়ের আংশিক খাওয়া ফল খেলে।
  • মানুষ থেকে মানুষে: আক্রান্ত রোগীর লালা, রক্ত, প্রস্রাব বা সর্দির সংস্পর্শে এলে সুস্থ ব্যক্তিও আক্রান্ত হতে পারেন।

ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের পর সুপ্ত অবস্থায় ৪ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৪৫ দিন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে, যা রোগ শনাক্তকরণকে কঠিন করে তোলে।

লক্ষণসমূহ

সংক্রমণের শুরুর দিকে সাধারণ জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

  • তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথা।
  • খিঁচুনি ও পেশিতে ব্যথা।
  • গলাব্যথা ও বমি হওয়া।
  • শ্বাসকষ্ট।
  • মারাত্মক পর্যায়: সংক্রমণ মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়লে ‘এনকেফালাইটিস’ বা মস্তিষ্কের প্রদাহ দেখা দেয়। এতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রোগী অচেতন হয়ে পড়তে পারেন বা কোমায় চলে যেতে পারেন।
চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়

দুঃখজনক বিষয় হলো, নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর টিকা বা সুনির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এই রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। চিকিৎসকরা মূলত রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী সাপোর্টিভ চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত আরটি-পিসিআর (RT-PCR) পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাস শনাক্ত করতে হয়। এর জন্য গলার সোয়াব, রক্ত বা প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

সতর্কতাই একমাত্র বাঁচার উপায়

যেহেতু এই রোগের কোনো প্রতিষেধক নেই, তাই সচেতনতাই হলো সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিম্নলিখিত সতর্কতাগুলো মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:

১. কাঁচা রস বর্জন: কোনো অবস্থাতেই কাঁচা খেজুরের রস খাওয়া যাবে না। এমনকি কাঁচা রস ফ্রিজে রেখে বা হিমায়িত করেও খাওয়া নিরাপদ নয়। একমাত্র উচ্চ তাপে জ্বাল দিয়ে গুড় বা পায়েস তৈরি করে খাওয়া নিরাপদ।

২. ফলমূল ধুয়ে খাওয়া: কোনো ফল বা সবজি খাওয়ার আগে অবশ্যই পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। আংশিক খাওয়া বা পাখির ঠোকরানো ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

৩. গাছিদের সতর্কতা: যারা গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন, তাদের সংস্পর্শে আসার পর ভালো করে সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধুতে হবে এবং পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

৪. রোগী থেকে দূরত্ব: আক্রান্ত রোগীর সেবা করার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র সাবধানে পরিষ্কার করতে হবে এবং ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

৫. দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া: কারো মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

শীতের সকালে খেজুরের রস নিঃসন্দেহে বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সামান্য অসচেতনতা ডেকে আনতে পারে করুণ পরিণতি। তাই কাঁচা রস পরিহার করুন এবং সুস্থ থাকুন।

সূত্র: বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন