শিল্পকারখানার আগ্রাসন: বর্জ্যের বিষে কমছে কৃষি জমি, বাড়ছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি:

ঢাকার ধামরাই উপজেলায় অপরিকল্পিত শিল্পায়নের দাপটে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কৃষি জমি। যত্রতত্র গড়ে ওঠা কল-কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক ও অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি মিশছে নিচু আবাদি জমিতে। এতে মাটি হারাচ্ছে তার চিরায়ত উর্বরতা, কমছে ফসলের উৎপাদন। একইসঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খলে ভারী ধাতুর প্রবেশে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকরা।

বর্জ্যের বিষে নীল কৃষি জমি

উপজেলার ডাউটিয়া ও জয়পুরা মৌজাসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ চিত্র। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলোর বর্জ্য কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই ফেলা হচ্ছে পাশের কৃষি জমিতে ও জলাশয়ে। কারখানার কালো ধোঁয়া আর বর্জ্য মিশ্রিত দুর্গন্ধযুক্ত পানি বাতাসের সঙ্গে মিশে বিষিয়ে তুলছে পরিবেশ।

কৃষকরা জানান, আগে যেসব জমিতে সোনালি ফসল ফলত, এখন সেখানে বিষাক্ত কালো পানি। এই রাসায়নিক মিশ্রিত পানিতে নেমে চাষাবাদ করতে গিয়ে তারা চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো ফলনও পাচ্ছেন না তারা।

গবেষণায় উঠে এলো ভয়াবহ চিত্র

সম্প্রতি ধামরাইয়ের ডাউটিয়া ও জয়পুরা এলাকার মাটি, পানি ও উৎপাদিত ধানের নমুনা পরীক্ষা করেছেন গবেষকরা। ফলাফলে দেখা গেছে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য। এসব নমুনায় ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে বলেন, “নমুনা পরীক্ষায় আমরা বিশেষ করে ভারী ধাতু যেমন—ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, নিকেল ও কপারের উপস্থিতি পেয়েছি। এসব ক্ষতিকর উপাদান ফসলের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। দীর্ঘমেয়াদে এই দূষিত খাবার গ্রহণের ফলে (Human Exposure) মানবদেহে ক্যান্সার, কিডনি বিকলসহ নানা ধরনের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”

ইটিপি না থাকায় বিপর্যয়

পরিবেশ ও নগরবিদরা বলছেন, শিল্পকারখানাগুলোতে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি (Effluent Treatment Plant) প্ল্যান্ট থাকা বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ কারখানায় তা নেই। আবার কোথাও থাকলেও খরচ বাঁচাতে তা বন্ধ রাখা হয়। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি প্রকৃতিতে মিশে এই বিপর্যয় ডেকে আনছে।

হাইলাইটস 

  • সঙ্কট: অপরিকল্পিত শিল্পায়নে কমছে আবাদি জমি।
  • কারণ: কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য ও ইটিপি ব্যবহার না করা।
  • গবেষণা ফল: মাটি ও ফসলে ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, নিকেলের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি।
  • ঝুঁকি: খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত ধাতু প্রবেশে ক্যানসারসহ জটিল রোগের আশঙ্কা।
  • দাবি: কৃষকদের নিয়ে ‘সবুজ আন্দোলন’ গড়ে তোলার আহ্বান কৃষি বিভাগের।
কৃষি কর্মকর্তাদের উদ্বেগ ও আন্দোলনের ডাক

দূষণ রোধে এবং কৃষি জমি বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুর রহমান।

তিনি বলেন, “অপরিকল্পিত শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং যত্রতত্র আবাসন বা বাড়িঘর তৈরির কারণে আমাদের কৃষি জমি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। এটি অশনিসংকেত। আমাদের অগ্রগামী কৃষকদের নিয়ে একটি ‘সবুজ আন্দোলন’ গড়ে তুলতে হবে, যাতে আর কোনো ফসলি জমি নষ্ট না হয়।”

করণীয় কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি শিল্প মালিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে। বর্জ্য পানি পরিশোধন প্ল্যান্ট বা ইটিপি স্থাপন ও তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই দূষণ থেকে কিছুটা মুক্তি মিলতে পারে। অন্যথায় ধামরাইয়ের কৃষি ও জনস্বাস্থ্য এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন