কৃষি যন্ত্রের ‘জাদুকর’ আমির হোসেন: ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া:

বগুড়া শহরের কাটনারপাড়া। চারদিকে লোহা-লক্করের ঠুংঠাস শব্দ, ওয়েল্ডিংয়ের আলোর ঝলকানি আর গ্রিজমাখা ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা। এরই মাঝে একটি ছোট ওয়ার্কশপে বসে এক মনে কাজ করে চলেছেন আমির হোসেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাকে সাধারণ একজন মেকানিক মনে হতে পারে, কিন্তু তিনি আসলে বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের এক নীরব বিপ্লবীদের একজন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই, নেই বড় কোনো প্রকৌশল বিদ্যা—তবুও নিজের মেধা আর অভিজ্ঞতার জোরে তিনি পাল্টে দিচ্ছেন উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির চিত্র।

আমির হোসেন কেবল মেরামতকারী নন, তিনি একজন উদ্ভাবক। বিদেশি কৃষিযন্ত্রের নকশা দেখে তিনি হুবহু নকল করেন না; বরং দেশের মাটি ও কৃষকের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করেন নিজস্ব প্রযুক্তি। তার উদ্ভাবিত ৫০টিরও বেশি কৃষিযন্ত্র আজ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের মাঠে-ঘাটে। সস্তা, টেকসই এবং সহজলভ্য এসব যন্ত্রের কারণে কৃষকরা বিদেশি ব্যুয়বহুল ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে আস্থা রাখছেন। তার এই প্রচেষ্টায় একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে সাশ্রয় হচ্ছে শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।

গ্যারেজ থেকে উদ্ভাবক হয়ে ওঠা

আমির হোসেনের এই যাত্রার শুরুটা মসৃণ ছিল না। কিশোর বয়সেই অভাবের তাড়নায় বা কৌতূহলবশত বাড়ির পাশের একটি গ্যারেজে কাজ শিখতে শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে মোটরসাইকেল আর সেচ পাম্প মেরামতই ছিল তার কাজ। কিন্তু তার চোখ ছিল সব সময় যন্ত্রের ভেতরের কারিগরিতে।

মেরামতের কাজ করতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন, কৃষকরা যেসব বিদেশি যন্ত্র ব্যবহার করেন, তা দেশের মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। কখনো কাদায় চাকা আটকে যায়, কখনো ব্লেড ভেঙে যায়, আবার কখনো ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। বিদেশি মডেলগুলো বাংলাদেশের ছোট জমি, ভারী কাদা আর শক্ত মাটির কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়নি।

এই সমস্যাগুলোই আমিরকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি যন্ত্র ভেঙে দেখতেন, শিখতেন এবং নতুন করে জোড়া দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতেন—কোন অংশ কীভাবে কাজ করে। ঠিক সেই জায়গা থেকেই শুরু হয় তার উদ্ভাবনের পথচলা। বর্তমানে বগুড়া শহরের কাটনারপাড়ায় তার মূল ওয়ার্কশপ এবং শহরতলীর মাটিডালি এলাকায় আরেকটি শাখা রয়েছে। সেখানেই প্রতিনিয়ত চলে নতুন নতুন কৃষিযন্ত্র তৈরির কাজ।

বিদেশি নকশা, দেশি সমাধান

আমির হোসেনের কারখানায় তৈরি যন্ত্রগুলো দেখতে বিদেশি যন্ত্রের মতো হলেও কার্যকারিতায় তা সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি বিদেশি যন্ত্রের ভালো দিকগুলো গ্রহণ করেন, কিন্তু ত্রুটিগুলো সারিয়ে দেশীয় উপযোগী করে তোলেন।

তার ওয়ার্কশপে তৈরি হয় ধান কাটার মিনি-হার্ভেস্টার, ধান ঝাড়াই মেশিন, আলু তোলার ডিগার, মাল্টিকাল্টিভেটর, উন্নত রোটারি ঘাস কাটার মেশিন, সিডড্রিল, ভুট্টা ভাঙার যন্ত্র, রোটাভেটর, চাটাই মেশিন ও ড্রাই মিক্সারসহ ৫০টিরও বেশি কৃষিযন্ত্র। প্রতিটি যন্ত্রের পেছনে রয়েছে কৃষকের মাঠের অভিজ্ঞতা ও আমিরের নিজস্ব গবেষণার ছাপ।

বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার কৃষক আবুল কালামের অভিজ্ঞতাই এর প্রমাণ। তিনি বলেন, “বাজারে যে বিদেশি মিনি-হার্ভেস্টার আসে, তার ব্লেডের উচ্চতা আমাদের দেশের কাদামাটির জন্য বেশি। ফলে ফসল কাটতে গিয়ে গোড়া থেকে কাটা যায় না, অনেক ধান নষ্ট হয়। আমির ভাই সেই ব্লেডের উচ্চতা কমিয়ে দিলেন, চাকার গ্রিপ পাল্টালেন আর ইঞ্জিনের গিয়ারের অনুপাত এমনভাবে ঠিক করলেন যাতে কম শক্তির ইঞ্জিনেও যন্ত্র সহজে চলে। এখন আর কাদায় মেশিন আটকে যায় না।”

একইভাবে আলু তোলার যন্ত্র বা ‘ডিগার’ নিয়ে সমস্যার কথা জানান গাইবান্ধার কৃষক মনসুর আলী। তিনি বলেন, “আমার সমস্যার বিষয়টা জানালে আমির ভাই ব্লেডের কোণা পরিবর্তন করেন। শ্যাফটে শিল্ড বসান আর গিয়ারবক্সে নতুন সাপোর্ট যোগ করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই মাঠের সমস্যা দূর হয়ে যায়। বিদেশি কোম্পানি হলে তো মেশিনের সমস্যা জানাতেই মাস পার হয়ে যেত।”

সাশ্রয়ের অবিশ্বাস্য খতিয়ান

উত্তরাঞ্চলের কৃষি যন্ত্রের বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদেশি যন্ত্রের তুলনায় আমির হোসেনের তৈরি যন্ত্রের দাম অবিশ্বাস্য রকমের কম। স্থানীয় ডিলারদের তথ্যমতে, বাজারে একটি বিদেশি মিনি-হার্ভেস্টারের দাম যেখানে আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা, সেখানে আমিরের তৈরি একই ক্ষমতার মেশিন পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ একটি যন্ত্রেই কৃষকের সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় ২ লাখ টাকা।

আলু চাষিদের জন্য অপরিহার্য যন্ত্র ‘আলু ডিগার’। বিদেশি ডিগারের দাম ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। অথচ আমিরের তৈরি মডেলটি পাওয়া যাচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। এতে সাশ্রয় হচ্ছে ৮০ হাজার টাকার বেশি। রংপুরের আলুচাষিরা জানান, আমিরের তৈরি ডিগার শক্ত মাটিতেও আলুর ক্ষতি করে না, ফলে উৎপাদন নষ্ট হয় না।

একইভাবে বিদেশি মাল্টি কাল্টিভেটরের দাম ১ লাখ টাকার ওপরে হলেও আমিরের সংস্করণ বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ হাজার টাকায়। ধান ঝাড়াই মেশিনেও সাশ্রয় হচ্ছে ৫০-৬০ হাজার টাকা।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুসারে, বিগত ১০ বছরে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আমিরের তৈরি ২০ হাজারেরও বেশি যন্ত্র মাঠে ব্যবহৃত হচ্ছে। গড়ে প্রতিটি যন্ত্রে যদি ৩০ হাজার টাকাও সাশ্রয় ধরা হয়, তবে কৃষকের পকেটে বেঁচে গেছে ৬০ কোটি টাকার ওপরে। এছাড়া এসব যন্ত্রের স্পেয়ার পার্টস বা খুচরা যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়ায় বছরে আরও ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার বিদেশি পার্টস আমদানির খরচ বাঁচছে। সব মিলিয়ে এই এক ওয়ার্কশপ থেকেই শত কোটি টাকার জাতীয় সাশ্রয় হচ্ছে।

সহজ মেরামত ও জ্বালানি সাশ্রয়

আমির হোসেনের যন্ত্রের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ হলো এর সহজ মেরামতযোগ্যতা। বিদেশি যন্ত্র নষ্ট হলে তার পার্টস খুঁজে পাওয়া যেমন দুষ্কর, তেমনি সার্ভিসিং খরচও অনেক বেশি। কিন্তু আমির তার যন্ত্রের নকশা এমনভাবে করেছেন, যেন গ্রামের সাধারণ কামারশালা বা লোহার দোকানেও এর মেরামত করা সম্ভব হয়।

ওয়ার্কশপের কর্মী মনির হোসেন বলেন, “বিদেশি ডিজাইনে কৃষকের মাঠের সমস্যা নিয়ে ভাবা হয় না। কিন্তু কৃষকেরা যখন বলে কোন যন্ত্র কোথায় আটকে যাচ্ছে বা কোথায় ভেঙে যাচ্ছে, আমির ভাই সেটা রাতেই টেবিলে নিয়ে বসেন। পরদিনই তার ডিজাইনে পরিবর্তন আসে। তার কিছু যন্ত্রে গিয়ার অনুপাত ও ব্লেডের ঘূর্ণন সামঞ্জস্য করার কারণে জ্বালানি খরচ ১৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে।”

কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমির মাঠের চাহিদা থেকে ডিজাইন করেন। বিদেশি যন্ত্র কপি করলে হয়তো চেহারা মিলবে, কিন্তু কাজ মিলবে না। তিনি সেই কাজের সমন্বয়টাই করে দেন। যার কারণে মাঠের বাস্তব সমস্যার উপযোগী একটি দেশীয় প্রযুক্তি মডেল হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে।”

স্বীকৃতি আছে, নেই বড় সহায়তা

একজন গ্রামীণ উদ্ভাবক হিসেবে আমির হোসেনের ঝুলি একেবারে শূন্য নয়। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থা তাকে একাধিকবার সম্মাননা দিয়েছে। ২০০৮ ও ২০১১ সালে তিনি জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কারও পেয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তার তৈরি ধান ঝাড়াই যন্ত্র, মিনি-হার্ভেস্টার, ভুট্টা ভাঙা মেশিন ও জৈবসার মিক্সার মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে সন্তোষজনক ফলাফল পেয়েছে।

তবে এত সফলতার পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর হতাশা ও সীমাবদ্ধতার গল্প। আমিরের উৎপাদন কেন্দ্রটি এখনো একটি ছোট ওয়ার্কশপেই সীমাবদ্ধ। প্রতিদিন সীমিত সংখ্যক শ্রমিক, হাতে বানানো যন্ত্রাংশ আর প্রাথমিক সরঞ্জাম দিয়ে তিনি উৎপাদন চালান। মাসে খুব বেশি হলে ৮-১০টি যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব হয় তার পক্ষে।

আমিরের স্বপ্ন অনেক বড়, কিন্তু সামর্থ্য সীমিত। বড় ফ্যাক্টরিতে রূপ দেওয়ার জন্য যে আধুনিক মেশিনারি, দক্ষ শ্রমশক্তি আর বিশাল বিনিয়োগ দরকার, তা তার নাগালের বাইরে। ফলে বাজারে চাহিদা বাড়লেও তিনি উৎপাদন বাড়াতে পারছেন না। এছাড়া তার বহু নকশা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পেটেন্ট করা হয়নি। কোনো বড় প্রতিষ্ঠান তার নকশা বাণিজ্যিকভাবে চুরি করে নিলে তিনি আইনত কিছুই করতে পারবেন না—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

ভবিষ্যৎ ভাবনা

নিজের কাজ ও স্বপ্ন নিয়ে আমির হোসেন বলেন, “আমি যা বানাই, কৃষক সেটা নিজের হাতে ব্যবহার করে এবং খুশি হয়—এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। কিন্তু আমি যদি বড় পরিসরে উৎপাদন করতে পারতাম, তবে সারা দেশে যন্ত্রের দাম অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো। দেশও বছরে কয়েক কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা বাঁচাতে পারত। সরকারি বা বেসরকারি বড় সহযোগিতা না পেলে আমার একার পক্ষে এই বিপ্লবকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।”

আমির হোসেনের মতো উদ্ভাবকরাই বাংলাদেশের কৃষির আসল শক্তি। বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির যে পথ তিনি দেখিয়েছেন, তা যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তবে বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। প্রয়োজন শুধু একটুখানি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন