আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
তুরস্কের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত মধ্যাঞ্চলের কোনিয়া প্রদেশ এখন কৃষকদের জন্য আতঙ্কের জনপদ হয়ে উঠেছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে থাকা ভুট্টা ও গমের ক্ষেতে হঠাৎ করেই তৈরি হচ্ছে বিশাল সব গর্ত বা ‘সিঙ্কহোল’। মাটির নিচ থেকে পানি সরে গিয়ে তৈরি হওয়া এসব গর্তে যেকোনো সময় ধসে পড়ছে বিঘা বিঘা জমি।
জলবায়ু পরিবর্তন, অনাবৃষ্টি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ার কারণে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা।
শস্যক্ষেতে মৃত্যুর হাতছানি
কোনিয়া প্রদেশের কারাপিনার এলাকাটি মূলত কৃষিপ্রধান। কিন্তু এখন সেখানে ফসলের মাঠজুড়ে দেখা মিলছে অসংখ্য বড় গর্তের। কোথাও কোথাও একটি মাত্র ক্ষেতেই ১০টির বেশি সিঙ্কহোল তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক প্রাচীন পানিভরা গর্তও এখন শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে।
দৃশ্যত কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই মাটি ধসে এসব গর্ত তৈরি হওয়ায় কৃষিকাজ এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও সিঙ্কহোলের হঠাৎ সৃষ্টি মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য বড় হুমকি তৈরি করেছে।
কৃষকের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
কারাপিনারের কৃষক মুস্তাফা শিকের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে সেই ভয়াবহতা। গত দুই বছরে তার নিজের জমিতেই দুটি বিশাল সিঙ্কহোল তৈরি হয়েছে।
মুস্তাফা বলেন, “২০২৪ সালের আগস্টে যখন দ্বিতীয় গর্তটি তৈরি হয়, তখন আমার ভাই পাশেই কাজ করছিলেন। হঠাৎ বিকট ও ভয়ঙ্কর শব্দে মাটি ধসে পড়ে। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান।” ভূতত্ত্ববিদদের জরিপে তার জমিতে আরও দুটি জায়গাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে কখন সেগুলো ধসে পড়বে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
কোনিয়া টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্বের অধ্যাপক ফেতুল্লাহ আরিক জানান, পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “কোনিয়া অববাহিকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০টি সিঙ্কহোল শনাক্ত করা হয়েছে। আগে এই বৃদ্ধির হার ধীর ছিল, কিন্তু এখন তা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।”
অধ্যাপক আরিক আরও জানান, এর মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি খরা। আগে যেখানে বছরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আধা মিটার কমতো, এখন সেচ ও খরার কারণে তা বছরে ৪ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে।
অবৈধ কূপের দাপট ও পানির সংকট
বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় পানির সংকট মেটাতে কৃষকরা বাধ্য হয়ে আরও বেশি কূপ খনন করছেন, যার বড় একটি অংশই অনুমোদনহীন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ওই এলাকায় বৈধ কূপের সংখ্যা যেখানে প্রায় ৪০ হাজার, সেখানে অবৈধ কূপের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। এই বিপুল সংখ্যক কূপ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনের ফলে মাটির নিচের কাঠামো ফাঁপা ও দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার পরিণতিতে সৃষ্টি হচ্ছে এসব সিঙ্কহোল।
(সূত্র: রয়টার্স)
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.