নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কখনো লোনা পানির আগ্রাসন, কখনো ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব, আবার কখনো তীব্র খরা—প্রকৃতির এমন বৈরী আচরণ এখানকার কৃষকদের নিত্যসঙ্গী। এমন পরিস্থিতিতে যখন অধিকাংশ কৃষক অধিক ফলনের আশায় বাজারজাত হাইব্রিড বীজের পেছনে ছুটছেন, তখন স্রোতের বিপরীতে হাঁটছেন শ্যামনগরের পশ্চিম কৈখালী গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান।
তিনি কোনো কৃষি বিজ্ঞানী নন, তবে তার কাজ হার মানাতে পারে বড় বড় গবেষকদেরও। নিজের জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনন্য ‘ধান ব্যাংক’। চাষ করছেন ১৬২টি স্থানীয় জাতের ধান। শুধু চাষাবাদই নয়, ধান কাটার মৌসুমে পরম মমতায় সংরক্ষণ করেন এসব বীজ। বিলিয়ে দেন প্রতিবেশী কৃষকদের মাঝে, শেখান সংরক্ষণের কৌশল। হাবিবুরের দাবি—লবণাক্ততা, ঝড় আর খরার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় হাইব্রিড নয়, স্থানীয় জাতের ধানই কৃষকের আসল রক্ষাকবচ।
‘মা বীজ’ ও হাবিবুরের দর্শন
কৃষক হাবিবুর রহমান স্থানীয় জাতের এই বীজগুলোকে ডাকেন ‘মা বীজ’ নামে। তার মতে, আধুনিক সব উচ্চফলনশীল বা হাইব্রিড ধানের আদি উৎস এই স্থানীয় জাতগুলোই।
হাবিবুর বলেন, “স্থানীয় বীজগুলো হলো মা বীজ। মূলত এই বীজের সঙ্গে সংকরায়িত করেই ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমি আমার জমিতে ১৬২ জাতের ধান লাগিয়েছি, ঠিক তার পাশের প্লটেই ‘ব্রি-৫১’ লাগিয়েছি। এই ব্রি-৫১ উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও কোনো না কোনো স্থানীয় জাতের জিন ব্যবহার করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, তার সংগ্রহে থাকা ১৬২টি জাতের মধ্যে এমন কিছু ধান আছে যা কেবল বেঁচে থাকার মাধ্যম নয়, বরং উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল। এর মধ্যে চিনিকানি, বেগুন বিচি, কালোজিরা, সুভাষ, জেসমিন—এগুলো সুগন্ধি চাল এবং বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা ও দাম রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাইব্রিড বনাম দেশি জাত
উপকূলীয় এলাকার কৃষিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চারটি—ঝড়, বন্যা, খরা ও শীত। হাবিবুর রহমানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় জাতের ধান হাইব্রিডের চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী।
লবণাক্ততা সাতক্ষীরার কৃষির প্রধান শত্রু। হাবিবুর বলেন, “আমার সংগ্রহে এমন অনেক জাত আছে, যেগুলো প্রাকৃতিকভাবেই লবণাক্ততা সহনশীল। এই মাটি ও জলবায়ুতে তারা সহজেই টিকে থাকতে পারে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই এসব ধান বেড়ে ওঠে।”
ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “কদিন আগেই ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ আঘাত হেনেছিল। ঝড়ের দাপটে হাইব্রিড বা উচ্চফলনশীল ধান গাছ একবার মাটিতে পড়ে গেলে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। সেক্ষেত্রে ফলন ৩০ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু স্থানীয় জাতের ধানগাছ ঝড়ে নুয়ে পড়লেও ঝড় থামলে নিজে থেকেই আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। এতে প্রায় ৯০ শতাংশ ফলন পাওয়া যায়।”
এছাড়া খরার ক্ষেত্রেও স্থানীয় জাতের জুড়ি নেই। পানির স্তর নিচে নেমে গেলে বা মাটিতে রস কম থাকলেও স্থানীয় কিছু আগাম জাতের ধান অনায়াসেই ঘরে তোলা যায়।
হাইব্রিডের ‘ফাঁদ’ ও কৃষকের স্বাধীনতা
হাবিবুর রহমানের মতে, হাইব্রিড বীজের আগ্রাসনে কৃষক তার স্বাধীনতা হারাচ্ছে। তিনি এটিকে কৃষকের জন্য একধরনের ‘ফাঁদ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, “হাইব্রিড বীজ থেকে বীজ রাখা যায় না। ওটা একবার কিনে একবারই ফসল হয়, এক বারেই শেষ। পরের বার আবার কৃষককে টাকা নিয়ে কোম্পানির দরজায় দৌড়াতে হয়। এতে চাষি ফসলের প্রধান উপকরণ বীজের জন্য কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।”
অন্যদিকে দেশি বীজের সুবিধা তুলে ধরে তিনি বলেন, “স্থানীয় বীজের বৈশিষ্ট্য হলো, আপনি ১০ বছর বা ২০ বছর পরও যদি বীজ সংরক্ষণ করেন, তবুও এর মৌলিকতা ও গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে। হাইব্রিড বীজের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি, কারণ এটি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু স্থানীয় বীজ চাষাবাদে সার-কীটনাশক লাগে না বললেই চলে।”
হাবিবুরের সংগ্রহশালা: বিচিত্র সব ধানের নাম
হাবিবুর রহমানের ফসলের মাঠ যেন ধানের এক জীবন্ত জাদুঘর। তার প্লটে চাষ হচ্ছে বিচিত্র নাম ও গুণের ১৬২ প্রজাতির ধান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
স্বর্ণমাশুরী, ভাওয়াইয়াল্য, সীতাভোগ, গেউস, মালাগাতি, ঝুমকা আমন, রানী স্যালট, চিনিকানি, রনজিত, নোনাকচি, চিনিশাইল, চাঁদমুন্নি, মৌলতা, সাহেবকচি, ইঞ্চি, কলমিলতা, মন্তেশ্বর, তিলবাজাইল, ছিয়ার, নেপালী, দারশাইল, বেনাপোল, আবজী, স্বর্ণা, মরিচশাইল, কাজলশাইল, খাইনল, চাপনালী, ভরত, নেড়াবেত, ভোলানাথ, নারকেলমুচি, খ্যাকশাইল, ঘুন্সি, পংকীরাজ, জয়শ্রীরাম, ন্যাড়াজামাইনাড়ু, আতব, ক্ষীরকুন, মালতি, কালশি, রিতু পাইজাম, আগুনাবিন্নী, সুভাস, বহুরীমোটা, নরসিংহজোটা, গানজিয়া, কুটেপাটনাই, সৈয়দমোটা, রুপশাইল, তেজমিনিকেট, খাড়ামোটা, দিশারী, মধূশাইল, মালা, চিনিসাগর, স্বর্ণপংকজ, বদ্দীরাজ, মগাইবেতী, বুকাইরা, রাজাশাইল, বাবুই, সাগরফণা, হরি, কাঁচড়া, বোরোঝাঁপি, ক্যাশরাইল, তেইশবালাম, আঁশফাইল, সাদাগোটাল, বৌসোহাগী, আইজং, সতীন, গোবিন্দভোগ, গচি, সাদাস্বর্ণা, নাজিরশাইল, চরোবালাম, ক্যারেংগাল, গুটিস্বর্ণ, কালোমোটা, গারোআইজং, দুধকলম, বেগুনবিচি, হরগোজা, খাসকিনি, মোতামোটা, সোনালী পাইজাম, আরমান খাসকিনি, পিপড়ার চোক, কেওয়ামৌ, বাঁশমতি, ব্লাকরাইচ, দুর্গাভোগ, খাবুল দুলহান, খেজুরছড়ি, হোগলা, জটাইবালাম, রুপেশ্বর, গচ্চা, বাঁশফুলবালাম, বজ্রমুড়ি, রহমান ইরি, অহনা, কালোজিরা, চরবলেশ্বর, সিলেটবালাম, লিলি, কিরনশাইল, ঢেঁকীমালা, চাঁদমুনি, মগাইবালাম, চাপশাইল, ঘি-গজ, ডাকশাইল, হলদে গোটাল, কাটারীভোগ, তুলশিমালা, পোকখালী, বোরোঝাঁপী, হাতিবজোড়, গেড়িমুড়ি, পাটনাই, কস্তুরি, কাঠিগচ্চা, লালগোটাল, জেসমিন, আলী কাঞ্চন, ময়নামতি, বিন্নী, মহিনীস্যালট, লালকুমড়ী, কাঞ্চন, কাডিভিট, বিরুইন, লালমোটা, কুমড়াগোড়, হরিশংক, চারুলতা, সকাল উড়ি, পাংগাস, কার্তিশাইল, সুপারশ্যামলী, মালাকীট, জল কস্তুরী, মড়াবাজাল, ভুটেস্যালট, হামাই, সাদামোটা, মইরম, মহিমে, গাবরাইল, সুধা, চাপলী, ইয়রচাউল, তিলেককচি, আইটি, গৌর কাজল, বড়ান ও স্বর্ণলতা।
হাইলাইটস
- উদ্যোক্তা: কৃষক হাবিবুর রহমান (শ্যামনগর, সাতক্ষীরা)।
- সংগ্রহ: ১৬২টি স্থানীয় জাতের ধান।
- মূল সুবিধা: লবণাক্ততা, খরা ও ঝড় সহনশীল। সার-কীটনাশক লাগে না।
- হাইব্রিড সমস্যা: বীজ সংরক্ষণ করা যায় না, উৎপাদন খরচ বেশি।
- বিশেষজ্ঞ মত: খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য স্থানীয় জাত রক্ষা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
হাবিবুর রহমানের এই উদ্যোগকে কেবল ব্যক্তিগত শখ হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গবেষণার জন্য এই উদ্যোগ জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাকে সহযোগিতা করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ’ (বারসিক)।
বারসিকের কর্মসূচি কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ মন্ডল বলেন, “স্থানীয় জাত থেকেই বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে উচ্চফলনশীল বা হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেন। সবকিছুর মূলে আছে স্থানীয় জাত। এই জাত রক্ষা না করলে আমাদের ভবিষ্যৎ গবেষণা, প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন এবং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা—সবকিছুই হুমকির মুখে পড়বে। যেকোনো মূল্যে হাইব্রিডের নির্ভরতা থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে স্থানীয় জাত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) সাতক্ষীরা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কামরুজ্জামান স্থানীয় ও হাইব্রিড বীজের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাতক্ষীরার জন্য কৃষিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা। স্থানীয় জাতগুলোতে ফলন সামান্য কম হলেও এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলার অসাধারণ ক্ষমতা থাকে। কারণ এসব বীজ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করেই টিকে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে নতুন নতুন যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে, তা মোকাবিলায় স্থানীয় বীজ বৈচিত্র্য অধিক কার্যকর।”
ড. কামরুজ্জামান আরও বলেন, “এফ-১ জেনারেশনের হাইব্রিড বীজ থেকে কৃষক নিজেরা বীজ উৎপাদন করতে পারে না। ফলে তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আমরা যদি স্থানীয় উচ্চফলনশীল বীজ থেকে বীজ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের ওপর কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তবে তারা নিজেরাই বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে এবং হাইব্রিডের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। বিজ্ঞানীদের কাজ হলো স্থানীয় বীজের সহনশীল বৈশিষ্ট্যগুলোকে শংকরায়নের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল জাতে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে কৃষক একইসঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলা ও অধিক ফলন—উভয় সুবিধাই পায়।”
উপকূলের লোনা বাতাসে যখন কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা, তখন হাবিবুর রহমানের এই ‘ধান ব্যাংক’ দেখাচ্ছে আশার আলো। তার এই প্রচেষ্টা শুধু একটি গ্রামের জন্য নয়, বরং গোটা বাংলাদেশের টেকসই কৃষির জন্য এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.