নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া:
একসময় যে বালুচর ছিল কৃষকের জন্য অভিশপ্ত, সেই ধু-ধু বালুচরই এখন আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার কৃষকদের কাছে। যমুনা ও বাঙালি বিধৌত চরাঞ্চলের পতিত জমি এখন আর খালি পড়ে থাকে না। আধুনিক সেচ ব্যবস্থার কল্যাণে সেখানে ফলছে সোনা। ধান, মরিচ, ভুট্টার পাশাপাশি এবার চরাঞ্চলে মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে।
সবচেয়ে আশার কথা হলো, বগুড়ার চরে উৎপাদিত এই বিষমুক্ত মিষ্টি কুমড়া এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে মালয়েশিয়ায়। বাম্পার ফলন ও রপ্তানি সুযোগ তৈরি হওয়ায় চরের কৃষকদের মুখে এখন চওড়া হাসি।
অভিশপ্ত চর এখন শস্যভান্ডার বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে যমুনা ও বাঙালি নদী। শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাভূমি একসময় সেচ সুবিধার অভাবে পতিত থাকত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চিত্র পাল্টে গেছে। সেচ পাম্প বসিয়ে কৃষকরা এখন বালু মাটিতেই ফলিয়ে তুলছেন নানা ফসল।
কৃষকরা জানান, মিষ্টি কুমড়া স্বল্পমেয়াদী ও লাভজনক ফসল। বীজ বপনের মাত্র ৯০ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা যায়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলন হয়েছে চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি কুমড়ার ওজন হয়েছে ২ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত।
কৃষকের লাভ ও সাফল্যের গল্প সারিয়াকান্দির কাজলা ইউনিয়নের কুড়িপাড়া চরের সফল কৃষক রঞ্জু মিয়া। তিনি এবার ১৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করেছেন।
রঞ্জু মিয়া বলেন, “১৫ বিঘা জমিতে আবাদ করতে আমার মোট খরচ হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ফলন যা হয়েছে, তাতে আমি প্রায় ৮ লাখ টাকার কুমড়া বিক্রির আশা করছি। গত বছর ফলন কিছুটা কম হলেও এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় পোকার আক্রমণ হয়নি, ফলনও দ্বিগুণ হয়েছে।”
একনজরে বগুড়ার চরাঞ্চলের কুমড়া চাষ
- প্রধান এলাকা: সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার চরসমূহ।
- চাষের সময়কাল: ৯০ দিন।
- বাজারদর: ২০ টাকা (কেজি)।
- রপ্তানি গন্তব্য: মালয়েশিয়া।
- সোনাতলায় আবাদ: ১,২৭০ হেক্টর।
- সারিয়াকান্দিতে আবাদ: ১০৫ হেক্টর।
- কৃষকের সাফল্য: ২.৫ লাখ টাকা খরচ করে ৮ লাখ টাকা আয়ের নজির।
মালয়েশিয়ায় রপ্তানি ও নতুন সম্ভাবনা স্থানীয় বাজার ও রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাশাপাশি বগুড়ার মিষ্টি কুমড়ার বড় গন্তব্য এখন মালয়েশিয়া। সারিয়াকান্দি উপজেলার নিজ বলাইল গ্রামের চাষি আব্দুল আজিজ ঠান্ডু জানান, শাহ সলিমুল্লাহ পেস্তা নামের এক রপ্তানিকারক তাদের এলাকা থেকে মিষ্টি কুমড়া, আলু, পেঁয়াজ ও মরিচ কিনে মালয়েশিয়ায় পাঠাচ্ছেন। রপ্তানির সুযোগ থাকায় এবং দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা পতিত জমি ফেলে না রেখে কুমড়া চাষে ঝুঁকছেন।
বিশেষ করে সোনাতলা উপজেলার তেকানী চুকাইনগর ও পাকুল্লা ইউনিয়নের ৯টি চরে উৎপাদিত প্রচুর পরিমাণ মিষ্টি কুমড়া রপ্তানি প্রক্রিয়ার অংশ হচ্ছে।
পরিসংখ্যান ও বাজারদর বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় এ পর্যন্ত ৪২৭ হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছে, যা ৫০০ হেক্টর ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- সোনাতলা উপজেলা: এ বছর ১ হাজার ২৭০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ১৫০ হেক্টর বেশি।
- সারিয়াকান্দি উপজেলা: লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১০৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।
- ফলন: প্রতি হেক্টরে ২০ থেকে ২২ টন।
বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিঘা চুক্তিতেও ক্ষেত থেকে ফসল কিনে নিচ্ছেন। এসব কুমড়া পঞ্চগড়, রংপুর, দিনাজপুর ও ঢাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ বলেন, “কৃষি অফিসের পরামর্শে চরের পতিত জমিতে কুমড়া চাষ করে কৃষকরা বেশ লাভবান হচ্ছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। বগুড়ার চরাঞ্চলের কৃষকরা মিষ্টি কুমড়া চাষ করে একদিকে যেমন নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়েছেন, তেমনি পতিত জমিকে লাভজনক সম্পদে পরিণত করেছেন। রপ্তানির ধারা অব্যাহত থাকলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।”
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.