সার ও তেলের দাম বৃদ্ধিতে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ থাকলেও মধুতে নতুন স্বপ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:
শীতের শিশিরভেজা সকালে কুয়াশার চাদর ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে সাতক্ষীরার দিগন্তজোড়া সরিষা ক্ষেত। যেদিকে চোখ যায়, শুধু হলুদ আর হলুদ। বাতাসের তালে দোল খাওয়া সরিষা ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা গ্রামীণ জনপদ। ফুলের রেণু সংগ্রহে মৌমাছির অবিরাম ছোটাছুটিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে মাঠ।
প্রকৃতির এই রূপের আড়ালে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষা ক্ষেতের পাশে স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মৌ-বক্স। একদিকে বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষক, অন্যদিকে মৌচাষিরা বুনছেন ৭৫ মেট্রিক টন মধু আহরণের স্বপ্ন।
ঘুরে দাঁড়িয়েছে সরিষার আবাদ সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর (২০২৪) অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে জেলায় সরিষার আবাদ কমে ১৭ হাজার ৫৩১ হেক্টরে নেমে এসেছিল। অথচ তার আগের বছর (২০২৩) চাষ হয়েছিল ১৯ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে। তবে চলতি মৌসুমে (২০২৫) সেই ক্ষতি পুষিয়ে আবারও আবাদ বেড়েছে। এবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমি। বিশেষ করে সদর, তালা, কলারোয়া ও দেবহাটা উপজেলায় সরিষার আবাদ চোখে পড়ার মতো।
কৃষকের শঙ্কা ও আক্ষেপ মাঠভরা ফসল থাকলেও কৃষকদের মনে স্বস্তি নেই। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা। তালা উপজেলার কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “এবার তিন বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছি। ফসল ভালো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু খরচ আকাশছোঁয়া। গত বছর যে সার ১৭ টাকায় কিনেছি, এবার সেটা ৩০ টাকায় কিনতে হয়েছে। যদি ন্যায্যমূল্য না পাই, তবে লাভ তো দূরের কথা, আসল খরচ তোলাই কঠিন হবে।”
কলারোয়ার চাষি রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “আশ্বিন মাস থেকে জমি প্রস্তুত করতে হয়। বিঘা প্রতি ৫-৬ মণ সরিষা হলেও খরচ পড়ে যায় ৬-৭ হাজার টাকা। কৃষি উপকরণের সংকট আর সময়মতো সহযোগিতা না পাওয়ায় আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।”
মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌচাষিরা সরিষা ক্ষেতগুলো এখন মৌচাষিদের পদচারণায় মুখর। সাতক্ষীরা জেলা মৌচাষি ও মধু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, “সরিষা ফুলের মধুর আলাদা কদর আছে। এবার মধুর স্বাদ ও মান দুটোই ভালো হবে। সরকারি সহযোগিতা পেলে সাতক্ষীরার এই মধু বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।”
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌ-বক্স বসালে পরাগায়ন বাড়ে। এতে সরিষার ফলন ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ এটি কৃষক ও মৌচাষি—উভয়ের জন্যই লাভজনক।
একনজরে সাতক্ষীরায় সরিষা ও মধু চাষ
- মোট আবাদি জমি: ১৯,০৫০ হেক্টর (লক্ষ্যমাত্রা)।
- মৌ-বক্স স্থাপন: প্রায় ১০,০০০টি।
- মধু উৎপাদনের লক্ষ্য: ৭৫ মেট্রিক টন।
- মধুর বাজারদর: ১৫-১৭ হাজার টাকা (প্রতি মণ)।
- কর্মসংস্থান: প্রায় ১৫,০০০ মানুষ।
- কৃষকের চ্যালেঞ্জ: সারের দাম বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ।
অর্থনীতিতে মধুর অবদান সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে ২৮ জন পেশাদার মৌচাষি প্রায় ১০ হাজার মৌ-বক্স বসিয়েছেন। প্রতিটি বক্স থেকে মৌসুমে ৫-৭ বার মধু সংগ্রহ করা যায়।
তিনি বলেন, “এ বছর ৭৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ সরিষা ফুলের মধু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকায়। এছাড়া বরই, লিচু ও সুন্দরবন এলাকার মধু মিলিয়ে সারা বছর ভ্রাম্যমাণ মৌচাষিরা মধু সংগ্রহ করেন। এ খাতে জেলায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।”
ভেজাল রোধে কঠোর নজরদারি মধু খাঁটি কি না, তা যাচাই করতে মাঠে নেমেছে জেলা নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর। নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা দীপংকর দত্ত জানান, তারা ভ্রাম্যমাণ ল্যাবের মাধ্যমে নিয়মিত মধু পরীক্ষা করছেন। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল দিলে বা চিনির শিরা মিশিয়ে মধু তৈরি করলে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন…
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.