লবণের মাঠে ফলছে ‘লাল সোনা’: আগাম টমেটোতে ৭ কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন

কক্সবাজার প্রতিনিধি:

একসময় কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে ছিল শুধুই সাদা লবণ আর মাছের ঘের। শুষ্ক মৌসুমে লবণ আর বর্ষায় মাছ চাষই ছিল হাজারো মানুষের একমাত্র জীবিকা। কিন্তু লবণের দরপতন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। লোকসানের মুখে পেশা বদলে ফেলা সেই চাষিরাই এখন লবণের মাঠে ফলাচ্ছেন ‘লাল সোনা’ খ্যাত আগাম জাতের টমেটো।

উপজেলার সুতাচুরা এলাকায় প্রায় ৭০ কানি (১১ হেক্টর) জমিতে আগাম টমেটো চাষ করে বাজিমাত করেছেন চাষিরা। মৌসুমের আগেই ফলন এবং চড়া দাম পাওয়ায় এই এক মৌসুমে প্রায় ৭ কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন তারা।

লবণ ছেড়ে সবজিতে সমৃদ্ধি

গত কয়েক বছর ধরে লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ঋণের বোঝা বাড়ছিল উজানটিয়ার চাষিদের। বাঁচার তাগিদে গত পাঁচ বছর ধরে তারা লবণসহিষ্ণু ধান ও শীতকালীন সবজি চাষে ঝুঁকছেন। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে আগাম টমেটো।

সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে দেশে টমেটোর ভরা মৌসুম থাকে, তখন দামও কমে যায়। কিন্তু পেকুয়া কৃষি অফিসের তথ্যমতে, উজানটিয়ার চাষিরা সেই প্রথা ভেঙে অক্টোবরেই টমেটো বাজারজাত শুরু করেছেন। সুতাচুরার প্রায় ৬০-৭০ জন চাষি এখন এই বিপ্লবের সারথী।

লাভ ও উৎপাদনের হিসাব

সরেজমিনে দেখা যায়, ক্ষেতজুড়ে লাল-সবুজ টমেটোর সমারোহ। প্রায় ৩০০ নারী-পুরুষ শ্রমিক ব্যস্ত সময় পার করছেন পরিচর্যায়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে:

  • জমির পরিমাণ: ৭০ কানি (১১ হেক্টর)।
  • গড় উৎপাদন: প্রতি কানিতে ১০ মেট্রিক টন। মোট প্রত্যাশিত উৎপাদন ৭০০ মেট্রিক টন।
  • বর্তমান বাজারদর: পাইকারি ১০০-১২০ টাকা প্রতি কেজি।
  • সম্ভাব্য আয়: মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি টাকা।
  • বিনিয়োগ ও মুনাফা: প্রতি কানিতে খরচ ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকা। বিপরীতে আয় হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগের চেয়ে লাভ ৩-৪ গুণ বেশি।

প্রবাসীর হাত ধরে সফলতার গল্প

উজানটিয়ায় এই আগাম টমেটো বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন প্রবাসী ফেরত তাজুল ইসলাম। শখের বশে মাত্র ১৪ শতক জমিতে চাষ শুরু করে ব্যাপক লাভবান হন তিনি। তার সাফল্য দেখে এখন পুরো এলাকাবাসী এই চাষে যুক্ত হয়েছে।

তাজুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে আমি ১০০ শতক জমিতে টমেটো চাষ করছি। ক্ষেত থেকেই পাইকারি ১০০-১২০ টাকায় টমেটো বিক্রি হচ্ছে। আমার জীবনের সব ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছে এই টমেটো। এখন এলাকার অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছে।”

নারী উদ্যোক্তা জন্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “স্বামী লবণ চাষে বারবার লোকসান দিচ্ছিল। পরে দুজনে মিলে টমেটো চাষ শুরু করি। এখন সপ্তাহে তিন-চার দিন টমেটো তুলতে পারি, সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা।”

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

উজানটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আহসান হাবিব জানান, টমেটো চাষ স্থানীয় মানুষের জীবনমান বদলে দিলেও সড়কের বেহাল দশার কারণে বাজারজাতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হতেন।

উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামশুদ্দীন বলেন, “চাষিরা প্রশিক্ষণ নিয়ে টমেটো চাষে দক্ষ হয়ে উঠছেন। নারী-পুরুষ উভয়েই এতে যুক্ত হয়েছেন, ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে।”

কৃষি বিভাগের ভাষ্য

পেকুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইছা বলেন, “লবণের জমিতে আগাম টমেটো চাষ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কৃষকদের প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সরকারি কোনো প্রণোদনা বা সহায়তা এলে এই টমেটো চাষিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন