নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
সাধারণত গ্রীষ্মকালে তরমুজ পাওয়া গেলেও এবার শীতের শুরুতে অসময়ে তরমুজ চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কৃষকরা। আধুনিক ‘মালচিং’ ও ‘মাচাং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের নিশ্চিন্তা, মসজিদিয়া, বুজননগর ও মাছুমেরতালুক গ্রামের কৃষকরা এখন রঙিন স্বপ্ন বুনছেন। কম খরচে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ লাভের সুযোগ থাকায় এই অঞ্চলে অসময়ে তরমুজ চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে।
চাষ পদ্ধতি ও প্রসার
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে মিরসরাইয়ে মাত্র ৫০ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে অসময়ের তরমুজ চাষ শুরু হয়। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে সেই চাষের পরিধি বেড়ে এবার দাঁড়িয়েছে ৩০০ শতকে।
‘স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (এসএসিপি)’-এর আওতায় উপজেলা কৃষি অফিস থেকে ৮ জন কৃষককে প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিজ উদ্যোগে চাষ করেছেন আরও ২ জন কৃষক। মালচিং পেপার, সার, বীজ ও প্রশিক্ষণসহ সবধরণের সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
একনজরে মিরসরাইয়ের তরমুজ চাষ
- মোট জমির পরিমাণ: ৩০০ শতক।
- চাষ পদ্ধতি: মালচিং ও মাচাং।
- জাত: ব্লাকবেরি, বাংলালিংক, সূর্যডিম।
- সময়কাল: রোপণ থেকে ৭০-৭৫ দিন।
- খরচ ও লাভ: খরচ বাদ দিয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ লাভ।
- বর্তমান বাজারদর: ৭০-৯০ টাকা (প্রতি কেজি)।
কৃষকদের সাফল্যের গল্প
সরেজমিনে দেখা যায়, মাচায় ঝুলছে ব্লাকবেরি, বাংলালিংক ও সূর্যডিমসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজ। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।
নতুন উদ্যোক্তা কৃষক রাজু চন্দ্র দাশ বলেন, “আমি প্রথমবার ৩৩ শতক জমিতে ৬টি জাতের তরমুজ চাষ করেছি। মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করায় ফলন খুবই ভালো হয়েছে। আমার খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। আশা করছি ৩ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারব। কয়েকদিনের মধ্যেই বিক্রি শুরু হবে।”
দুই বছর ধরে তরমুজ চাষ করছেন কৃষক মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, “প্রথমবার সফলতা পাওয়ায় এবারও ৩৩ শতক জমিতে চাষ করেছি। কৃষি অফিস থেকে মালচিং পেপার, সার ও বীজ পেয়েছি। আমার খরচ হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। আশা করছি দেড় থেকে ২ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে।”
বাজারদর ও কৃষি অর্থনীতি
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জানান, বীজ রোপণ থেকে মাত্র ৭০-৭৫ দিনের মধ্যে এই তরমুজ বিক্রির উপযোগী হয়। উৎপাদিত প্রতিটি তরমুজের ওজন ৩ কেজি থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। তিনি বলেন, “বাজারে এখন তরমুজের সরবরাহ কম থাকায় দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। প্রকারভেদে প্রতি কেজি তরমুজ ৭০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় ক্রমান্বয়ে অসময়ের তরমুজ চাষি বাড়ছে।”
মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (খৈয়াছড়া ও মসজিদিয়া ব্লক) মোহাম্মদ শাহজাহান গণমাধ্যমকে বলেন, “এসএসিপি প্রকল্পের আওতায় আমরা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮টি প্রদর্শনী স্থাপন করেছি। আমি নিয়মিত চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং ক্ষেত পরিদর্শন করছি। গত ৩ বছর ধরে আমার ব্লকে এই চাষ হচ্ছে এবং অল্প সময়ে ভালো লাভ হওয়ায় কৃষকরা এতে আরও আগ্রহী হচ্ছেন।”
আগামীতে আরও বড় পরিসরে মিরসরাইয়ে অসময়ের তরমুজ চাষ সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.