নিজস্ব প্রতিবেদক:
আম মানেই গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ আর জ্যৈষ্ঠের মিষ্টি ঘ্রাণ—বাঙালির এই চিরায়ত ধারণায় এখন বড় পরিবর্তন এসেছে। আম এখন আর শুধু গ্রীষ্ম বা বর্ষার ফল নয়, প্রযুক্তির কল্যাণে তা পৌঁছে গেছে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল পর্যন্ত। এ বছর শরৎ-হেমন্ত এমনকি শীতেও বাজারে মিলছে পর্যাপ্ত পাকা আম। তবে এগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা নয়, বরং দেশের মাটিতেই উৎপাদিত অমৌসুমি জাত ‘কাটিমন’।
একসময় এই মৌসুমে দেশের বাজার দখলে থাকত বিদেশি আম। কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করছে দেশি কাটিমন। সুস্বাদু ও অসময়ে পাওয়া যায় বলে চাষি এবং ভোক্তা—উভয় মহলেই বাড়ছে এর কদর।
শুরুর গল্প: ভিয়েতনাম থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ
দেশে কাটিমন আমের যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়। প্রায় আট বছর আগে, ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ধাইনগর গ্রামের এনামুল হকের বাগানে প্রথম এই আমের সফল চাষ হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের সহায়তায় ভিয়েতনাম থেকে এই আমের সায়ন (ডাল) সংগ্রহ করেন এনামুল।
এরপর ১০-১২ বছর বয়সী ক্ষীরশাপাতি ও লক্ষ্মণভোগ গাছে ‘টপ ওয়ার্কিং’ বা ভিনিয়ার গ্রাফটিং পদ্ধতিতে কলম করেন। পরের বছরই ফলন আসতে শুরু করে। সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র আট বছরের ব্যবধানে এই আমের উৎপাদন ও জনপ্রিয়তা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে।
নওগাঁর সাপাহারে সফলতার চিত্র
কাটিমন আমের বর্তমান অবস্থা দেখতে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার কুচকুরিলার ডাঙাপাড়া গ্রামে গেলে চোখে পড়ে এক বিস্ময়কর দৃশ্য। হেমন্তের শেষে বা শীতের শুরুতে যখন আমগাছ থাকার কথা ফলশূন্য, তখন সেখানকার নাসির উদ্দীনের বাগানের প্রতিটি গাছে ঝুলছে আম।
কোনো ডালে মুকুল, কোনোটিতে গুটি, আবার কোনোটিতে পাকা আম—একই গাছে সব বয়সের ফলের সমাহার। নাসির উদ্দীন জানান, ২ একর জমিতে তার প্রায় ৯০০টি গাছ রয়েছে। ২০১৯ সালে বাগানটি তৈরি করার পর ২০২২ সাল থেকে তিনি পূর্ণমাত্রায় ফলন পাচ্ছেন। চলতি মৌসুমে তিনি শুধু আম বিক্রি করেই আয় করেছেন প্রায় ১০ লাখ টাকা। এছাড়া কলম বিক্রি করেছেন আরও ৮০ হাজার টাকার।
কেন ঝুঁকছেন চাষিরা?
প্রচলিত ধান বা শস্য রেখে আম চাষে কেন ঝুঁকছেন—এমন প্রশ্নে নাসির উদ্দীন জানান, অমৌসুমি আম চাষ অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে অধিক লাভজনক।
তিনি বলেন, “আমের ভরা মৌসুমে (গ্রীষ্মকালে) আমি এই বাগানের আম নিই না। কারণ তখন বাজারে প্রচুর আম থাকে এবং দাম কম থাকে। কিন্তু শীতে যখন বাজারে আম থাকে না, তখন কাটিমন বিক্রি করে চড়া দাম পাওয়া যায়। অর্থনৈতিকভাবে এটি গেম চেঞ্জার।”
স্বাদ ও বিভ্রান্তি
বাজারে অনেক সময় কাটিমন আম নিয়ে নেতিবাচক কথা শোনা যায়। এর মূল কারণ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বেশি মুনাফার লোভে তারা অপরিপক্ব আম বাজারে নিয়ে আসেন, যা খেতে পানসে বা টক হয়।
তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, বাস্তবতা হলো সঠিক সময়ে এবং পরিপক্ব অবস্থায় গাছ থেকে পাড়া হলে কাটিমন আমের স্বাদ সত্যিই দারুণ। অমৌসুমি ফল হিসেবে এর স্বাদ ও মিষ্টতা অতুলনীয়।
নতুন চাষিদের জন্য পরামর্শ
কৃষি বিশেষজ্ঞরা এবং সফল উদ্যোক্তারা বলছেন, কাটিমন আম চাষে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও হুজুগে বাগান করা যাবে না। কেউ যদি এই আম চাষ করতে আগ্রহী হন, তবে তাকে অবশ্যই সঠিক চাষপদ্ধতি, মাটির গুণাগুণ এবং জাত চিনে কাজ শুরু করতে হবে। ভালোভাবে না জেনে বাগান করলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.