নিজস্ব প্রতিবেদক:
পৌষের শুরুতেই জেঁকে বসতে শুরু করেছে শীত। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে প্রকৃতি। এরই মধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তর দিয়েছে সতর্কবার্তা—চলতি মৌসুমে দেশে ৪ থেকে ৭টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে পড়তে পারে ঘন কুয়াশা।
দেশের মোট উৎপাদিত ধানের অর্ধেকের বেশি জোগান দেয় বোরো ধান। বর্তমানে হাওরাঞ্চলসহ দেশের বেশিরভাগ এলাকায় চলছে বোরোর বীজতলা তৈরির কাজ। কৃষিবিদরা আশঙ্কা করছেন, একনাগাড়ে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীত অব্যাহত থাকলে বোরো ধানের বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে পড়তে পারে, যা ধানের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে।
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস: কেমন যাবে শীত?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের শীতে শীতের অনুভূতি গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি হতে পারে।
- শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা: পুরো মৌসুমে দেশে ৪ থেকে ৭টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
- তীব্র শৈত্যপ্রবাহ: উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে ২ থেকে ৩টি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ (তাপমাত্রা ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- কুয়াশা: শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও নদ-নদী অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে আসায় শীতের তীব্রতা বেশি অনুভূত হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, “কুয়াশা ও মেঘের কারণে সূর্যের দেখা মিলছে না, তাই শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে শীত আরও বাড়তে পারে।”
একনজরে শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা:
- মৃদু শৈত্যপ্রবাহ: ৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
- মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ: ৬-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
- তীব্র শৈত্যপ্রবাহ: ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বোরো আবাদ ও বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে:
- আবাদি জমি: ৫০ লাখ ৫৩ হাজার ৮৩১ হেক্টর।
- উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা: ২ কোটি ২৭ লাখ ৬৭ হাজার ৪৭১ টন চাল।
- বীজতলা: ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৯১ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
বীজতলা রক্ষায় কৃষকদের করণীয়
ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীত বোরো বীজতলার জন্য মারাত্মক হুমকি। এতে চারা হলুদ হয়ে মারা যেতে পারে বা ‘কোল্ড ইনজুরি’তে আক্রান্ত হতে পারে। এই ক্ষতি এড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের পরিচালক মো. ওবাদুর রহমান মন্ডল ও কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের কিছু প্রাচীন ও কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন:
১. পলিথিন ব্যবহার: রাতে তীব্র শীত ও কুয়াশা থেকে রক্ষা করতে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে এবং দিনের বেলা সরিয়ে দিতে হবে। ২. সেচ পদ্ধতি: রাতে বীজতলায় পানি দিয়ে রাখা এবং সকালে সেই পানি বের করে দেওয়া। এতে মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। ৩. আদর্শ বীজতলা: গতানুগতিক পদ্ধতির বদলে আদর্শ বীজতলা তৈরি করা, যা পরিচর্যার জন্য সুবিধাজনক।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, “অধিক কুয়াশা বোরোর বীজতলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবহাওয়া অধিদপ্তরকে জটিল ভাষায় পূর্বাভাস না দিয়ে কৃষকের বোধগম্য সহজ ভাষায় আগাম বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। এলাকাভেদে সতর্কবার্তা দিলে কৃষক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারবেন।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো কারণে কুয়াশায় বীজতলা নষ্ট হয়, তবে সরকারিভাবে বিকল্প বীজের অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং আপদকালীন পরিকল্পনা (Plan B) প্রস্তুত রাখতে হবে।”
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.