পাহাড় নয়, সমতলেই কমলার রাজ্য: নিভৃত পল্লীতে হাবিবুরের বাজিমাত

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:

কমলা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিলেট বা পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো পাহাড়ি দৃশ্য। কিন্তু সেই ধারণা এখন বদলে যাচ্ছে। পাহাড়ের সুমিষ্ট কমলা এখন চাষ হচ্ছে দেশের সমতল ভূমিতেও। ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার নিভৃত পল্লী বেগমপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে এমনই এক দৃষ্টিনন্দন কমলার বাগান।

গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগোলেই নাকে ভেসে আসবে পাকা কমলার মিষ্টি ঘ্রাণ। বাগানে ঢুকলে দেখা যায়, গাঢ় সবুজ পাতার আড়ালে থোকায় থোকায় ঝুলছে হলুদ আর কমলা রঙের রসালো ফল। ইউটিউব দেখে শুরু করা এক শখের প্রচেষ্টা এখন বাণিজ্যিক সফলতায় রূপ নিয়েছে।

ইউটিউব থেকে ৪ বিঘার বাগান

বেগমপুর গ্রামের সফল কৃষি উদ্যোক্তা হাবিবুর রহমান। পাঁচ বছর আগে ইউটিউবে আধুনিক কমলা চাষের একটি ভিডিও দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। সমতলে কমলা চাষ সম্ভব—এই বিশ্বাস থেকে তিনি পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে উন্নতমানের চারা সংগ্রহ করেন। এরপর নিজের প্রায় চার বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেন কমলার আবাদ।

শুরুর দিকে অভিজ্ঞতা না থাকায় কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও দমে যাননি হাবিবুর। ধীরে ধীরে হাতে-কলমে শিখে নেন পরিচর্যার কৌশল। তার সেই পাঁচ বছরের পরিশ্রমের ফল মিলেছে এ বছর। বাগানের প্রতিটি গাছ এখন ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে।

গাছপ্রতি ১৫০ কেজি ফলন

সরেজমিনে দেখা যায়, হাবিবুরের বাগানে কমলার বাম্পার ফলন হয়েছে। তিনি জানান, সঠিক পরিচর্যার ফলে এ বছর প্রতিটি গাছে ১২০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত কমলা ধরেছে। ফলের আকার, রং এবং স্বাদ—সবদিক থেকেই এটি পাহাড়ের কমলার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, “ইউটিউব দেখে উৎসাহ পেয়েছিলাম। শুরুতে ভয় ছিল, কিন্তু এখন বাস্তবে দেখছি আমাদের মাটিতেও দারুণ কমলা হয়। এই চাষে সার ও কীটনাশকের খরচ তুলনামূলক অনেক কম। যে ফলন হয়েছে, তাতে এবার বড় ধরনের লাভের আশা করছি। আমার সফলতা দেখে এলাকার অনেকেই এখন কমলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।”

কৃষি বিভাগের ভাষ্য: নতুন সম্ভাবনার দ্বার

মহেশপুর উপজেলার মাটি ও আবহাওয়া কমলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, “বেগমপুর গ্রামের এই বাগান প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সমতলেও কমলার বাম্পার ফলন সম্ভব। হাবিবুরের এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ফলন ও লাভ—উভয় দিক থেকেই এটি উৎসাহব্যঞ্জক। ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে কমলা চাষের পরিধি আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।”

একনজরে হাবিবুরের কমলা বাগান

  • অবস্থান: গ্রাম- বেগমপুর, উপজেলা- মহেশপুর, ঝিনাইদহ।
  • উদ্যোক্তা: হাবিবুর রহমান।
  • জমির পরিমাণ: ৪ বিঘা।
  • শুরুর গল্প: ৫ বছর আগে ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে।
  • বর্তমান ফলন: প্রতি গাছে ১২০-১৫০ কেজি।
  • সুবিধা: সার ও কীটনাশক খরচ কম, উচ্চ মুনাফা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

হাবিবুরের এই সফলতা দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও এখন ধান-পাটের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চমূল্যের ফসল চাষে ঝুঁকছেন। কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঝিনাইদহের এই অঞ্চলটি একসময় ফলের রাজ্য হিসেবে পরিচিতি পাবে।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন