চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের ‘শস্যভান্ডার’ খ্যাত চন্দনাইশ উপজেলায় চলতি মৌসুমে শীতকালীন সবজি শিম চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং গত কয়েক বছর ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা শিম চাষে ঝুঁকেছেন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার উপজেলায় প্রায় ৫২ কোটি টাকার শিম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বেড়েছে চাষের পরিধি ও উৎপাদন উপজেলা কৃষি অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মৌসুমে উপজেলায় ৪২০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছিল। ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ হেক্টরে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চাষ বেড়েছে ১৩০ হেক্টর জমিতে। কৃষিবিদদের মতে, এই বাড়তি ১৩০ হেক্টর জমির শিমের বাজারমূল্যই প্রায় ১২ কোটি টাকা। আর পুরো উপজেলার ৫৫০ হেক্টর জমি থেকে এবার অন্তত ৫২ কোটি টাকার শিম বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিমের রাজ্যে দোহাজারী ও ধোপাছড়ি উপজেলার ২ পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে দোহাজারী পৌরসভা, ধোপাছড়ি ও হাশিমপুর ইউনিয়নে শিমের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়েছে।
- দোহাজারী পৌরসভা: প্রায় ১৭০ হেক্টর।
- ধোপাছড়ি ইউনিয়ন: ১৬০ হেক্টর।
- হাশিমপুর ইউনিয়ন: ৬০ হেক্টর।
শঙ্খ নদের তীরের উর্বর মাটি ও চরাঞ্চল শিম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এসব এলাকায় ফলনও হয়েছে বাম্পার।
বাজারদর ও কৃষকের লাভ সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। কৃষকরা পরিপক্ব শিম তুলে বাজারে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গত ১৫ দিন ধরে দোহাজারী পাইকারি বাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিম সরবরাহ করা হচ্ছে।
- পাইকারি দর: ৫০-৬০ টাকা কেজি।
- খুচরা দর: ৬০-৭০ টাকা কেজি।
কৃষকদের হিসাব মতে, এক কানি (২০ গন্ডা) জমি থেকে মৌসুমে প্রায় দেড় লাখ টাকার শিম বিক্রি করা সম্ভব। সেই হিসাবে প্রতি হেক্টরে আয় হয় ৯-১০ লাখ টাকা।
কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, “আমি এবার ২ কানি (প্রায় ৮০ শতক) জমিতে শিম চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। ক্ষেত থেকেই পাইকারি ৬০ টাকা দরে বিক্রি করছি। এই দামে আমরা খুশি।”
তরুণদের জন্য নতুন পথ চাষি মো. হাসান ও আবু বক্কর মনে করেন, কৃষি এখন আর অবহেলার পেশা নয়। তারা বলেন, “শঙ্খচরের মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে বিজ্ঞানসম্মত কৃষিকাজে মনোযোগ দিলে এটিই হতে পারে সফলতার অন্যতম পথ।”
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের কৃষকরা জানান, নব্বইয়ের দশক থেকে এলাকায় ব্যাপকভাবে শিম চাষ শুরু হয়। অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত চলা এই শিম বিক্রির টাকা দিয়ে কৃষকরা ঋণ পরিশোধ করেন এবং সারা বছরের সংসারের খরচ জমা রাখেন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মানেশ দে জানান, দোহাজারী পৌরসভার চাগাচর, লালুটিয়া ও জামিজুরী এলাকায় গতবারের চেয়ে ৩০ হেক্টর বেশি জমিতে শিম চাষ হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আজাদ হোসাইন বলেন, “পাহাড়, নদী ও সমতল ভূমি ঘেরা এই এলাকা শীতকালীন সবজির জন্য চট্টগ্রামের শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত। মূলা, বেগুন, ফুলকপির পাশাপাশি শিম চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।”
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.