‘নীরব ঘাতক’ অ্যাসিডে পুড়ছে ফসলি জমি: ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা

কুমিল্লা প্রতিনিধি:

কুমিল্লা সদর উপজেলার গোমতী চরের কৃষক মো. সুজন এবার আশা নিয়ে অগ্রিম শীতকালীন ফসল হিসেবে মুলা চাষ করেছিলেন। ক্ষেতজুড়ে ফলনও এসেছিল ভালো। কিন্তু ফসল তুলতে গিয়ে মাথায় হাত পড়ে তার। মাটির নিচ থেকে তোলা অধিকাংশ মুলা কালো হয়ে ফেটে গেছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের শরণাপন্ন হলে জানতে পারেন, কোনো পোকা বা সাধারণ রোগ নয়, বরং জমির মাটিতে অ্যাসিড বা অম্লের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই বিপর্যয় ঘটেছে।

সুজন আক্ষেপ করে বলেন, “চাহিদা থাকায় মাঠে থাকা অবস্থাতেই প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকার মুলা বিক্রি করেছিলাম। কিন্তু সব নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ক্রেতাকে সেই টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। শুধু এক মাঠেই আমার সাড়ে ছয় লাখ টাকার ক্ষতি।”

শুধু সুজন নন, কুমিল্লার আমতলী, লাকসাম, বরুড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকদের জন্য ‘নীরব ঘাতক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাটির এই অম্লতা বা অ্যাসিড। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার প্রায় ৫০ শতাংশ জমি এবং চারটি উপজেলার শতভাগ আবাদি জমি এখন উচ্চমাত্রার অ্যাসিডে আক্রান্ত।

বিপর্যয়ের পরিসংখ্যান

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য বলছে, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

  • আক্রান্ত এলাকা: কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের কৃষি জমি।
  • কুমিল্লার পরিস্থিতি: জেলার প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাব বেড়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা সদর, লাকসাম, বরুড়া ও লালমাই উপজেলার প্রায় শতভাগ জমিতে অ্যাসিডের পরিমাণ বিপজ্জনক হারে বেড়েছে।
  • পুষ্টির ঘাটতি: এই অঞ্চলের ৯৩ শতাংশ মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া ৯৭ শতাংশ মাটিতে নাইট্রোজেন, ৮৬ শতাংশে ফসফরাস, ৮৯ শতাংশে পটাশিয়াম এবং ৬৬ শতাংশ মাটিতে সালফারের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।

কেন বাড়ছে মাটিতে অ্যাসিড?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির পিএইচ (pH) বা পটেনশিয়াল হাইড্রোজেনের মান ৫.৫-এর নিচে নেমে গেলে তা ফসলের জন্য ক্ষতিকর। কুমিল্লার প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে পিএইচ-এর মান ৪.৫-এ নেমে এসেছে।

এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে:

১. রাসায়নিক সারের অতিব্যবহার: একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলাতে গিয়ে কৃষকরা মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন।

২. জৈব সারের অভাব: মাটিতে প্রাণ হিসেবে পরিচিত জৈব সার বা কেঁচো সারের ব্যবহার কমে গেছে।

৩. অসচেতনতা: মাটি পরীক্ষা না করেই বছরের পর বছর চাষাবাদ।

কুমিল্লা মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, “অ্যাসিড বা অম্লের মান বেড়ে গেলে মাটিতে যতই সার দেওয়া হোক না কেন, গাছ তা গ্রহণ করতে পারে না। ফলে গাছ পুষ্টি পায় না এবং ফলন কমে যায়।”

কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সমাধান

মাটির এই স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে কৃষি কর্মকর্তারা কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন।

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “তিন বছরে অন্তত একবার জমিতে ডলোচুন বা গুঁড়া চুন ব্যবহার করতে হবে। এতে মাটির অম্লতা কমে আসবে এবং সারের কার্যকারিতা বাড়বে। এছাড়া সালফার জাতীয় সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে।”

সদর দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুনায়েদ কবির খান পরামর্শ দেন, “জমি চাষের আগে কৃষকদের অবশ্যই ডলোচুন ব্যবহার করা উচিত। এটি খুব সহজ ও সাশ্রয়ী সমাধান।”

এছাড়া লালমাই উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা লায়লা আরজুমান কৃষকদের মাটি পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা কৃষকদের মাটি পরীক্ষার জন্য উৎসাহিত করছি এবং ফলাফল অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি।”

হাইলাইটস

  • ক্ষতির ধরণ: মুলাসহ বিভিন্ন সবজি কালো হয়ে যাচ্ছে, ফেটে যাচ্ছে এবং ধানের ফলন কমছে।
  • ভয়াবহতা: কুমিল্লার ৪ উপজেলার ১০০% জমি অ্যাসিড আক্রান্ত।
  • কারণ: রাসায়নিক সারের অত্যধিক ব্যবহার ও জৈব পদার্থের অভাব।
  • সমাধান: মাটি পরীক্ষা করা এবং জমি চাষের আগে ডলোচুন বা গুঁড়া চুন ব্যবহার করা।
  • সতর্কবার্তা: মাটির স্বাস্থ্য ঠিক না করলে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি

গত মৌসুমে কুমিল্লায় ১ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে ধান এবং ৫৬ হাজার টনের বেশি সবজি উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু মাটির গুণাগুণ নষ্ট হতে থাকলে ভবিষ্যতে এই উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান সতর্ক করে বলেন, “কৃষক যদি আশানুরূপ ফলন না পান, তবে ব্যক্তিগতভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু এর বিশাল প্রভাব পড়বে আমাদের জাতীয় খাদ্য মজুদের ওপর। মাটির টপ সয়েল বা উপরিভাগ বাঁচাতে না পারলে জাতীয়ভাবে আমরা বড় ক্ষতির মুখোমুখি হবো।”

অ্যাসিডের কবলে চাষের জমি বাঁচানোর উপায় কি জেনে নিন?

মাটির অম্লতা বা অ্যাসিড বেড়ে গেলে গাছ মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে না, ফলে ফলন বিপর্যয় ঘটে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, চাষের জমিকে অ্যাসিড বা অম্লতা থেকে রক্ষা করার এবং মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. চুন বা ডলোচুন প্রয়োগ (সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি)

মাটির অম্লতা কমানোর প্রধান ও সবচেয়ে সহজ উপায় হলো চুন প্রয়োগ করা।

  • কি ব্যবহার করবেন: সাধারণ চুন (ক্যালসিয়াম কার্বনেট) অথবা ডলোচুন (ডলোমাইট)। ডলোচুন ব্যবহার করা বেশি ভালো, কারণ এতে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ম্যাগনেসিয়াম থাকে, যা মাটির গুণাগুণ বাড়ায়।

  • কখন প্রয়োগ করবেন: ফসল বোনার বা চারা রোপণের অন্তত ১৫-২০ দিন আগে জমিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে।

  • ব্যবহারবিধি: জমি চাষ দিয়ে মাটির সাথে চুন ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে এবং জমিতে হালকা সেচ দিতে হবে যাতে চুন মাটির সাথে বিক্রিয়া করতে পারে।

  • সতর্কতা: চুন এবং রাসায়নিক সার (বিশেষ করে ইউরিয়া) কখনো একসাথে প্রয়োগ করবেন না। এতে নাইট্রোজেন নষ্ট হয়ে যায়।

২. প্রচুর পরিমাণে জৈব সার ব্যবহার

রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। জৈব সার মাটির ‘বাফারিং ক্ষমতা’ বাড়ায়, যা পিএইচ (pH) মান নিয়ন্ত্রণে রাখে।

  • কি ব্যবহার করবেন: পচা গোবর, কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট), বা খামারের আবর্জনা পচানো সার।

  • সবুজ সার: জমিতে ধঞ্চে বা কলাই জাতীয় গাছ লাগিয়ে তা ফুল আসার আগে মাটির সাথে মিশিয়ে সবুজ সার তৈরি করলে মাটির স্বাস্থ্য দ্রুত ফিরে আসে।

৩. কাঠের ছাই ব্যবহার

কাঠের ছাই ক্ষারীয় প্রকৃতির। এটি মাটির অ্যাসিড প্রশমন করতে সাহায্য করে। এছাড়া ছাইয়ে পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম থাকে যা গাছের জন্য উপকারী। তবে এটি স্বল্প পরিসরে বা কম আক্রান্ত জমির জন্য প্রযোজ্য।

৪. সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার

দীর্ঘদিন ধরে একই জমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া বা অ্যামোনিয়াম সালফেট এবং জিপসাম ব্যবহারের ফলে মাটি অ্যাসিডিক হয়ে যায়।

  • নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ সার হিসেবে অ্যামোনিয়ামের পরিবর্তে নাইট্রেট জাতীয় সার (যেমন- ক্যালসিয়াম নাইট্রেট) ব্যবহার করা যেতে পারে।

  • সালফার যুক্ত সারের ব্যবহার কমাতে হবে বা মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী দিতে হবে।

৫. মাটি পরীক্ষা (Soil Test)

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আন্দাজে চুন বা সার না দিয়ে নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিস বা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে (SRDI) মাটির নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে।

  • মাটি পরীক্ষা করলে জানা যাবে মাটির পিএইচ (pH) কত। পিএইচ মান ৭ এর নিচে হলে মাটি অম্লীয়।

  • মান যত কম, অম্লতা তত বেশি। পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী কৃষি কর্মকর্তারা বলে দেবেন ঠিক কতটুকু চুন বা ডলোচুন ওই জমির জন্য প্রয়োজন।

৬. সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা

মাটিতে যেন অতিরিক্ত পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আবার মাটি ধৌতকরণের (Leaching) মাধ্যমেও কিছু অ্যাসিডিক উপাদান বের করে দেওয়া সম্ভব, তবে এর জন্য ভালো ড্রেনেজ বা নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে।

জরুরি ভিত্তিতে আক্রান্ত জমিতে বিঘা প্রতি ৩ বছরে একবার মাটি পরীক্ষা করে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হবে এবং নিয়মিত চাষাবাদে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত জৈব সার নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন 


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন