‘মোজাইক’ আতঙ্ক: হলদে হয়ে মরছে বেগুন গাছ, লোকসানের শঙ্কায় চাষি

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠে এখন সবুজের বদলে হলদে রঙের বিষাদময় ছায়া। বাণিজ্যিক বেগুন চাষের জন্য বিখ্যাত এই জনপদে এবার হানা দিয়েছে ‘মোজাইক ভাইরাস’। ক্ষেতের পর ক্ষেত বেগুন গাছ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করছে, থমকে গেছে গাছের বৃদ্ধি। মৌসুমের মাঝপথে এমন বিপর্যয়ে ফলন নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠজুড়ে বেগুন গাছে ভাইরাসের প্রকোপ। অনেক গাছের পাতা হলুদ হয়ে কুঁকড়ে ঝরে পড়ছে। কিছু গাছ গোড়াসহ বিবর্ণ হয়ে নিস্তেজ হয়ে গেছে। কৃষকরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে বন্যার পানি ওঠায় জমিতে নোনাভাব সৃষ্টি হয়, যা গাছকে দুর্বল করে দেয়। সেই সুযোগেই জাব পোকা ও সাদা মাছির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস।

কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ৩০ শতক জমিতে বেগুন চাষ করেছেন স্থানীয় কৃষক মাজেদুল ইসলাম। গত বছর লাভবান হওয়ায় এবার উৎসাহ নিয়ে চাষের পরিধি বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাকে হতাশ করেছে।

আক্ষেপ করে মাজেদুল বলেন, “গতবার লাভ হওয়ায় এবার দ্বিগুণ জমিতে চারা লাগিয়েছিলাম। প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু গাছে ফুল আসার ঠিক আগমুহূর্তে ভাইরাস আর পোকা সব শেষ করে দিচ্ছে। শীত আর কুয়াশা যদি আরও বাড়ে, তাহলে গাছের বৃদ্ধি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ফলন বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়বে।”

শীত ও কুয়াশায় বাড়ছে ঝুঁকি ভাইরাসের পাশাপাশি আবহাওয়াও কৃষকের অনুকূলে নেই। রাজারহাট আবহাওয়া কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, রোববার জেলায় ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি মাসের শুরু থেকেই কুয়াশা বাড়ছে এবং সামনে শীত আরও জেঁকে বসার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিবিদরা বলছেন, অতিরিক্ত শীত ও কুয়াশা বেগুন গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির অন্তরায়।

আরও পড়ুন 

কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ কৃষি বিভাগের মতে, ‘মোজাইক ভাইরাস’ একবার গাছে আক্রমণ করলে তা সারানো প্রায় অসম্ভব। তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধেই জোর দিচ্ছেন তারা।

চিলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, “ভাইরাস আক্রান্ত গাছ জমিতে রাখা যাবে না, মায়া ত্যাগ করে তা তুলে গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। মূলত জাব পোকা, সাদা মাছি ও থ্রিপস—এই পোকাগুলো ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে। এদের দমনে কৃষকদের ‘ইমিডাক্লোরোপ্রিড’ গ্রুপের কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

হাইলাইটস

  • সমস্যা: বেগুন ক্ষেতে ব্যাপকহারে ‘মোজাইক ভাইরাস’-এর আক্রমণ।
  • লক্ষণ: গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে, কুঁকড়ে যাচ্ছে এবং বৃদ্ধি থমকে গেছে।
  • কারণ: বন্যার পরবর্তী লোনা মাটি, জাব পোকা ও সাদা মাছির আক্রমণ এবং বৈরী আবহাওয়া।
  • আবহাওয়া: তাপমাত্রা কমছে (১২.৫°সে.), বাড়ছে কুয়াশা, যা ফসলের জন্য ক্ষতিকর।
  • পরামর্শ: আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা এবং বাহক পোকা দমনে ইমিডাক্লোরোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার।

বাস্তবতা শীত, কুয়াশা আর ভাইরাসের ত্রিমুখী চাপে চিলমারীর বেগুন চাষ এখন হুমকির মুখে। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবার রঙিন বেগুনের বদলে তাদের ঘরে ফিরতে হবে লোকসানের ‘হলদে’ গল্প নিয়ে।

বেগুন গাছে ‘মোজাইক ভাইরাস’ প্রতিরোধে করনীয় ?

বেগুন গাছে ‘মোজাইক ভাইরাস’ (Mosaic Virus) একবার আক্রমণ করলে তা কোনো ওষুধ দিয়েই পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ এবং ছড়িয়ে পড়া রোধ করাই একমাত্র উপায়।

চিলমারীর কৃষকদের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও কৃষি বিজ্ঞানের আলোকে এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে করণীয় পদক্ষেপগুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

১. আক্রান্ত গাছ উপড়ে ফেলা (সবচেয়ে জরুরি ধাপ)

  • মায়া ত্যাগ করতে হবে: জমিতে কোনো গাছে মোজাইক ভাইরাসের লক্ষণ (পাতা হলুদ হওয়া, কুঁকড়ে যাওয়া, ছোপ ছোপ দাগ) দেখা মাত্রই সেটি গোড়াসহ তুলে ফেলতে হবে।
  • ধ্বংস করা: উপড়ে ফেলা গাছ জমির আশেপাশে ফেলে রাখা যাবে না। গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কারণ একটি অসুস্থ গাছ থেকে পোকার মাধ্যমে পুরো ক্ষেতে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

২. বাহক পোকা দমন (সাদা মাছি ও জাব পোকা)

মোজাইক ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না, এটি ছড়ায় মূলত সাদা মাছি (White fly), জাব পোকা (Aphids) ও থ্রিপস-এর মাধ্যমে। তাই এই পোকাগুলোকে দমন করলেই ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ হবে।

কীটনাশক প্রয়োগ: কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের গ্রুপগুলোর যেকোনো একটি কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে:

  • ইমিডাক্লোরোপ্রিড গ্রুপ (Imidacloprid): (যেমন: এডমায়ার, টিডো, ইমিটাফ, গেইন) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
  • এসিটামিপ্রিড গ্রুপ (Acetamiprid): (যেমন: টুন্ড্রা, মospilan) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে।
  • ডায়াফেনথিউরন গ্রুপ (Diafenthiuron): (যেমন: পেগাসাস) সাদা মাছি দমনে খুব কার্যকর।
  • স্প্রে করার নিয়ম: পাতার নিচের দিকে পোকাগুলো লুকিয়ে থাকে, তাই পাতার নিচ ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। ৭-১০ দিন পর পর বালাইনাশক পরিবর্তন করে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

৩. জৈব বা যান্ত্রিক পদ্ধতি (খরচ কমাতে)

  • হলুদ আঠালো ফাঁদ (Yellow Sticky Trap): সাদা মাছি হলুদ রঙের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ১০-১২টি হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করলে পোকা ফাঁদে আটকে মারা যাবে এবং কীটনাশক খরচ কমবে।
  • সাবান পানি: ডিটারজেন্ট পাউডার বা শ্যাম্পু (প্রতি লিটার পানিতে ১ চামচ) মিশিয়ে স্প্রে করলে পোকার আঠালো ভাব নষ্ট হয়ে যায় এবং মারা যায়।

৪. আগাছা পরিষ্কার রাখা

জমির আইলে বা বেগুনের গোড়ায় আগাছা থাকলে সেখানে পোকা আশ্রয় নেয়। তাই জমি সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

৫. হাতের স্পর্শ ও কৃষি যন্ত্রপাতি

আক্রান্ত গাছ হাত দিয়ে ধরার পর সেই হাত ধ না ধুয়ে সুস্থ গাছ ধরা যাবে না। এমনকি কাঁচি বা নিড়ানি ব্যবহারের আগেও জীবাণুনাশক বা সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। কারণ মানুষের স্পর্শের মাধ্যমেও এটি সুস্থ গাছে সংক্রমিত হতে পারে।

৬. সুষম সার ও পরিচর্যা

যেহেতু বন্যায় মাটি লোনা হয়ে গেছে এবং গাছ দুর্বল, তাই গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

  • বোরন ও জিংক: অনুখাদ্য হিসেবে জিংক ও বোরন স্প্রে করলে গাছের জোর বাড়ে।
  • সেচ: শীতে মাটি বেশি শুষ্ক হতে দেওয়া যাবে না, আবার অতিরিক্ত পানিও যেন না জমে। পরিমিত সেচ দিতে হবে।

ভবিষ্যতের জন্য পরামর্শ: পরবর্তী মৌসুমে চাষের আগে ‘মোজাইক ভাইরাস’ সহনশীল জাতের বেগুন (যেমন: বারি বেগুন-৪, ৮ বা ১০) নির্বাচন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এছাড়া বীজতলায় চারা থাকার সময় মশারি বা নেট দিয়ে ঢেকে রাখলে চারা অবস্থায় ভাইরাস আক্রমণ করতে পারে না।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন