পেঁয়াজ সংরক্ষণে ‘এয়ার ফ্লো’ প্রযুক্তির বাজিমাত: লাভবান কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এবং পচনজনিত ঘাটতি সমস্যার সমাধানে এক যুগান্তকারী সাফল্য নিয়ে এসেছে কৃষি বিভাগ। ‘এয়ার ফ্লো’ নামক আধুনিক প্রযুক্তির সফল ব্যবহারে চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের পচন রোধ করা সম্ভব হয়েছে, যার ফলে আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বছরজুড়ে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে, অন্যদিকে ভালো দাম পেয়ে লাভবান হয়েছেন কৃষকরা।

এয়ার ফ্লো প্রযুক্তি: পচন রোধে আধুনিক সমাধান

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, আগে উৎপাদিত পেঁয়াজের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে পচে যেত। ফলে চাহিদা মেটাতে বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হতো। কিন্তু ‘এয়ার ফ্লো’ প্রযুক্তির ব্যবহারে এই পচন এখন ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

কী এই প্রযুক্তি?

এয়ার ফ্লো প্রযুক্তিতে পেঁয়াজ মেঝেতে না রেখে মাচার ওপর গাদা করে রাখা হয়। গাদার পাশে বা নিচে একটি ব্লোয়ার বা ফ্যান লাগানো থাকে, যা নিয়ন্ত্রিত বাতাস প্রবাহিত করে।

  • কার্যকারিতা: ব্লোয়ারের বাতাস পেঁয়াজের স্তূপের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা কমিয়ে রাখে। ফলে ছত্রাক আক্রমণ করতে পারে না এবং পেঁয়াজ পচা, গলা বা নরম হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
  • সংরক্ষণকাল: সাধারণ পদ্ধতিতে পেঁয়াজ যেখানে ৪ মাসের বেশি রাখা যেত না, সেখানে এই প্রযুক্তিতে ৬ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ ভালো থাকছে।
  • খরচ: ১০ থেকে ১৪ টন পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য মেশিনের দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, যা কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী।

পরিসংখ্যান: উৎপাদনের ঊর্ধ্বগতি ও আমদানি হ্রাস কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

  • ২০২২-২৩ অর্থবছর: ৩৪ লাখ ১৬ হাজার টন।
  • ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার টন।
  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: ৪২ লাখ ৫০ হাজার টন।
  • লক্ষ্যমাত্রা (২০২৫-২৬): ৪২ লাখ ৬৪ হাজার টন।

সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, “দেশে ৩০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন বেশি হলেও পচনের কারণে ৪-৬ লাখ টনের ঘাটতি তৈরি হতো। এয়ার ফ্লো প্রযুক্তির কারণে সেই ঘাটতি এবার পূরণ হয়েছে।”

বাজারদর ও কৃষকের মুখে হাসি

বিগত বছরগুলোতে পেঁয়াজ আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকলেও এবার চিত্র ভিন্ন। টিসিবির তথ্যমতে, গত দুই বছরের তুলনায় এবার খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য লাভজনক।

পাবনার সুজানগর উপজেলার কৃষি প্রকৌশলী সুমন চন্দ্র কুন্ডু জানান, “প্রান্তিক পর্যায়ে এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহারের ফলে বছরজুড়ে সরবরাহের সমন্বয় ঘটেছে। কৃষকরা দাম পাওয়ায় নতুন করে চাষাবাদে আগ্রহী হচ্ছেন।”

ফরিদপুরের কৃষক হান্নান মাতুব্বর বলেন, “আমি দুটি এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহার করি। এতে পেঁয়াজ সহজে পচে না এবং শুকনো থাকে। গত মৌসুমে পেঁয়াজ বিক্রি করে লাভের টাকায় নতুন বাড়ি বানাতে পেরেছি।”

কৃষি বিভাগের ভাষ্য

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন গনমাধ্যমকে বলেন, “আগে সংরক্ষণের অভাবে উৎপাদিত পেঁয়াজ পচে ঘাটতি তৈরি করত। এবার এয়ার ফ্লো প্রযুক্তির কারণে সেই পচন রোধ করা গেছে। ফলে সারা বছর বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে এবং পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়নি।”

কৃষি কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই প্রযুক্তির প্রসারে আগামী দিনগুলোতে পেঁয়াজের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং দাম ভোক্তার নাগালের মধ্যে থাকবে।


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন