ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
সাধারণত গ্রীষ্মের দাবদাহে তৃষ্ণা মেটাতে তরমুজের জুড়ি নেই। তবে শীতের আমেজ শুরু হতে না হতেই ঝিনাইদহে মিলছে সুমিষ্ট ও রসালো তরমুজ। আধুনিক ‘মালচিং পদ্ধতি’ ব্যবহার করে অসময়ে এই গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সদর উপজেলার কৃষক আব্দুর রহিম বাদশা। মাত্র আড়াই মাসে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি আয় করেছেন সোয়া লাখ টাকা।
তার এই সাফল্য দেখে এখন এলাকার অন্য কৃষকরাও ঝুঁকছেন লাভজনক এই চাষে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মালচিং পদ্ধতিতে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ ঝিনাইদহের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
সরেজমিন চিত্র ও কৃষকের সাফল্য
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকে ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা সড়কের পাশেই আব্দুর রহিম বাদশার খেত। সেখানে মাচায় ঝুলছে শত শত তরতাজা তরমুজ। খেতটি দেখতে এখন ভিড় করছেন উৎসুক জনতা ও স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষক আব্দুর রহিম বাদশা জানান, নিজ উদ্যোগে বীজ সংগ্রহ করে গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তিনি ৫২ শতাংশ জমিতে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ রোপণ করেন। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে ব্যবহার করেন ‘মালচিং পেপার’ এবং পোকামাকড় থেকে বাঁচাতে তৈরি করেন ‘মাচা’ বা শেড।
তিনি বলেন, “৫২ শতাংশ জমিতে ১১টি মাচায় চাষ করেছি। বর্তমানে খেতে ২ হাজারের বেশি ফল রয়েছে। প্রতিটি ফলের ওজন ৩ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়েছে। ফলন, রং এবং স্বাদ অত্যন্ত ভালো।”
খরচ বনাম লাভ
মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে এই চাষে ব্যাপক লাভের মুখ দেখেছেন বাদশা। তিনি বলেন, “সবমিলিয়ে আমার খরচ হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে খেতের সব ফল পাইকারি ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছি। অর্থাৎ খরচ বাদে আমার নিট লাভ হয়েছে ৮০-৮৫ হাজার টাকা।”
একনজরে সফলতার খতিয়ান
- কৃষক: আব্দুর রহিম বাদশা।
- স্থান: হলিধানী ব্লক, ঝিনাইদহ সদর।
- জমির পরিমাণ: ৫২ শতাংশ।
- চাষ পদ্ধতি: মালচিং ও মাচাং।
- সময়কাল: আড়াই মাস (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর)।
- মোট খরচ: ৪০,০০০ টাকা।
- বিক্রয় মূল্য: ১,২৫,০০০ টাকা।
- নিট লাভ: প্রায় ৮৫,০০০ টাকা।
- ফলন: ২,০০০-এর বেশি তরমুজ।
মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টিমের পরিদর্শন
কৃষক বাদশার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সফলতা দেখতে গত ৬ নভেম্বর বিকেলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তার খেত পরিদর্শন করেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ফসল অনুবিভাগ, কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্মপ্রধান ফেরদৌসী আখতারের নেতৃত্বে পরিদর্শন টিমে ছিলেন উপপ্রধান রত্না শারমীন ঝরা ও সিনিয়র সহকারী প্রধান প্রিয়াংকা দেবী পাল।
তারা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের চলমান প্রকল্পের কার্যক্রম পরিদর্শনের অংশ হিসেবে এই তরমুজ খেত ঘুরে দেখেন এবং বাম্পার ফলন দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ মো. সেলিম রেজা, সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর এ নবী এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নূর এ নবী বলেন, “আব্দুর রহিম বাদশার এই উদ্যোগ জেলায় গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আমরা নিয়মিত কৃষকদের এমন লাভজনক ও আধুনিক প্রযুক্তির চাষে উদ্বুদ্ধ করছি।”
কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মপ্রধান ফেরদৌসী আখতার বলেন, “স্বল্পমেয়াদী ফসল হওয়ায় কৃষকরা গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষে আরও আগ্রহী হবেন বলে আমি মনে করি। এ ধরনের উদ্যোগে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে।”
আরও পড়ুন …
- মিরসরাইয়ে অসময়ে তরমুজ চাষে বাজিমাত: দ্বিগুণ লাভে ঝুঁকছেন কৃষকরা
- মাছের ঘেরে তরমুজ চাষে বাম্পার সাফল্য, কৃষকের মুখে হাসি
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.