আগাম বাঙ্গি চাষে বাজিমাত: ১০ হাজার টাকা খরচে আয় সোয়া লাখ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা:

সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণা মেটাতে বাঙ্গির কদর বাড়ে। কিন্তু হাড়কাঁপানো শীতে যদি মাঠে মিলছে রসালো ফল বাঙ্গি, তবে তা অবাক করার মতোই বিষয়। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের ঐচারচর গ্রামের কৃষকরা। আগাম বাঙ্গি চাষ করে তারা তাক লাগিয়ে দিয়েছেন, একইসঙ্গে পাচ্ছেন মৌসুমের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম।

অন্য ফসলে যেখানে লোকসানের ঝুঁকি থাকে, সেখানে ‘ফাটা বাঙ্গি’ যেন এই গ্রামের কৃষকদের কপাল জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে। অসময়ে এই চাষাবাদে বাম্পার ফলন ও আকাশচুম্বী দামে কৃষকদের মুখে এখন খুশির ঝিলিক।

সরেজমিন চিত্র: মাঠে ৮-১০ কেজির বাঙ্গি

তিতাস নদীর শাখা খালের পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা ঐচারচর গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠ। সেখানে কুমড়ো, সরিষা আর শসার ভিড়ে নজর কাড়ছে বাঙ্গির ক্ষেত। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাটির ওপর শুয়ে আছে ৮ থেকে ১০ কেজি ওজনের বিশাল সব বাঙ্গি। কিছু জমির ফসল তোলা শেষের দিকে, আবার কোথাও চলছে বাজারজাতকরণের প্রস্তুতি।

কৃষকরা জানান, ভরা মৌসুমে যে বাঙ্গি ১০০ টাকায় বিক্রি হতো, অসময়ে বাজারে চাহিদা থাকায় সেই একই বাঙ্গি এখন ক্ষেত থেকেই ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে নেওয়ার পথেই ক্রেতাদের কাড়াকাড়ি পড়ে যায়।

উদ্যোক্তা সাত্তার মিয়ার সাফল্য

ঐচারচর গ্রামে আগাম বাঙ্গি চাষের এই বিপ্লবের সূচনা করেছেন প্রবাস ফেরত কৃষক সাত্তার মিয়া। সনাতন পদ্ধতিতে সরাসরি মাটিতে বীজ বোনার প্রথা ভেঙে তিনি চারা তৈরি করে জমিতে রোপণ করেন এবং রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার ব্যবহার করেন।

সাত্তার মিয়া বলেন, “নতুন পদ্ধতিতে চাষ করতে দেখে প্রথমে অনেকে হাসাহাসি করেছিল। আমি ৩০ শতক জমিতে আগাম বাঙ্গি চাষ করেছি। এতে আমার খরচ হয়েছে মাত্র ১০ হাজার টাকার মতো। অথচ এখন পর্যন্ত সোয়া লাখ টাকার বাঙ্গি বিক্রি করেছি। এখনও অনেক বাঙ্গি বিক্রির বাকি আছে। কৃষি অফিসের পরামর্শে সঠিক বালাই ব্যবস্থাপনা করায় ফলন খুব ভালো হয়েছে।”

অনুপ্রেরণা ও বিস্তার

সাত্তার মিয়ার অভাবনীয় সাফল্য দেখে গ্রামের অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হয়েছেন। তার কাছ থেকে চারা নিয়ে চাষ শুরু করেছেন কৃষক মহসিন মিয়া ও মো. ইয়াছিন। তারাও মৌসুমের তুলনায় তিন গুণের বেশি দাম পেয়ে দারুণ খুশি। তারা জানান, আগামীতে আরও বেশি জমিতে এই আগাম চাষ করবেন।

একনজরে সফলতার খতিয়ান

  • স্থান: ঐচারচর গ্রাম, তিতাস উপজেলা, কুমিল্লা।
  • উদ্যোক্তা: প্রবাস ফেরত কৃষক সাত্তার মিয়া।
  • জমির পরিমাণ: ৩০ শতক।
  • বিনিয়োগ: ১০,০০০ টাকা।
  • বিক্রয়: ১,২৫,০০০ টাকা (চলমান)।
  • বাজারদর: ৫০০-৬০০ টাকা প্রতি পিস (মৌসুমে যা থাকে ১০০ টাকা)।
  • পদ্ধতি: চারা রোপণ ও জৈব সার ব্যবহার।
কৃষি বিভাগের ভাষ্য

স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. কাউছার আহমেদ বলেন, “ঐচারচর ব্লকে এবার প্রায় ১০ বিঘা জমিতে আগাম বাঙ্গির আবাদ হয়েছে। কৃষকরা জৈব সার ব্যবহার করায় ফলন চমৎকার হয়েছে। আমরা তাদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এখানে আগাম বাঙ্গি চাষের পরিধি বাড়ছে।”


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন