ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
‘দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দই’—কবি যোগীন্দ্রনাথ সরকারের কবিতায় দাদখানি চালের কথা পড়েনি এমন মানুষ কমই আছে। কিন্তু বাস্তবে দাদখানি, পঙ্খিরাজ, ভাষামানিক কিংবা দোলাভোগের মতো ধান এখন আর মাঠেই চোখে পড়ে না। উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধানের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী ধানগুলোকে আবারও ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন ঝিনাইদহের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহেল রানা।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ভাদড়া গ্রামে গড়ে তোলা ‘আদান-প্রদান’ নামের কৃষি খামারে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করেছেন বিলুপ্তপ্রায় ১০টি জাতের ধান। তার এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মাঝে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
হারিয়ে যাওয়া ধানের সন্ধানে হরিণাকুণ্ডুর দুর্লভপুর গ্রামের মৃত গোলাম রব্বানীর ছেলে সোহেল রানা। ঝিনাইদহ কেসি কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ’-এ কর্মরত আছেন। চাকরির সুবাদে তিনি লক্ষ্য করেন, অধিক ফলনের আশায় নতুন নতুন ধানের জাত চাষ করতে গিয়ে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ দেশি জাতগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। জিংকসমৃদ্ধ এবং রাসায়নিকমুক্ত এসব ধান ফিরিয়ে আনার তাগিদ থেকেই তিনি এই উদ্যোগ নেন।
একনজরে সোহেল রানার ‘আদান-প্রদান’ খামার
- অবস্থান: ভাদড়া গ্রাম, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ।
- সংরক্ষিত ধানের জাত: ১০টি (পঙ্খিরাজ, দাদখানি, বেগুনবিচি, ভাষামানিক, কলমকাটি, দোলাভোগ, এলাই, রানাশাইল, পরাঙ্গী, কৃষ্ণকলি)।
- জমির পরিমাণ: ১৫ শতাংশ (১০টি প্লট)।
- উদ্দেশ্য: বীজ সংরক্ষণ, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং রাসায়নিকমুক্ত চাষাবাদ।
স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির, স্থপতি সুহায়েলী পারভীন ও শিক্ষক আলমগীর কবিরের সহায়তায় সোহেল রানা ভাদড়া গ্রামের মাঠে ৫ বিঘা জমিতে ‘আদান-প্রদান’ খামার গড়ে তোলেন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও দেশি বীজ সংরক্ষণই এই খামারের মূল লক্ষ্য।
১০টি প্লটে ১০ জাতের ধান সোহেল রানা পাবনা, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ১০টি দুর্লভ জাতের ধানের বীজ সংগ্রহ করেন। এরপর খামারের ১৫ শতাংশ জমিকে ১০টি ছোট প্লটে ভাগ করে এই ধানগুলো চাষ করেন। জাতগুলো হলো—পঙ্খিরাজ, দাদখানি, বেগুনবিচি, ভাষামানিক, কলমকাটি, দোলাভোগ, এলাই, রানাশাইল, পরাঙ্গী ও কৃষ্ণকলি।
সোহেল রানা বলেন, “হারিয়ে যেতে বসা ধানগুলো বাঁচিয়ে রাখতেই আমার এই উদ্যোগ। বর্তমানে ধান পাকতে শুরু করেছে। এই ধানগুলো কেটে আমি চাল বানাব না, বরং বীজ তৈরি করব। যাতে ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে এসব ধানের চাষ ছড়িয়ে দেওয়া যায়।”
পুষ্টিগুণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য সোহেল রানা জানান, এসব দেশি জাতের ধানের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা হাইব্রিড ধানে পাওয়া যায় না।
- রানাশাইল: এটি সম্পূর্ণ লাল চাল, যা চিকিৎসকরা অনেক সময় রোগীদের খাওয়ার পরামর্শ দেন।
- বেগুনবিচি: এটি সুগন্ধিযুক্ত ধান, দেখতে বেগুনের বিচির মতো গোল।
- কলমকাটি: লম্বা ও সরু এই ধান অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহৃত হতো।
- জীবনকাল ও খরচ: এই ধানগুলোর জীবনকাল ৭৫ থেকে ৮৫ দিন। দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই হওয়ায় এতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না বললেই চলে। ফলন বিঘায় ১৪-১৫ মণ হলেও এর বাজারমূল্য ও পুষ্টিগুণ অনেক বেশি।
কৃষক ও কৃষি বিভাগের প্রতিক্রিয়া ভাদড়া গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, “পুরোনো দিনের ধান চাষ হচ্ছে শুনে আমরা প্রায়ই দেখতে আসি। গাছগুলো বেশ ভালো হয়েছে। যদি দেখি ফলন ভালো এবং বাজারে দাম বেশি, তবে ভবিষ্যতে আমরাও বীজ নিয়ে চাষ করব।”
ঝিনাইদহ কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “কৃষি গবেষণার জন্য এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এসব জাত টিকিয়ে রাখা জরুরি। যদিও অধিক ফলনশীল জাতের ভিড়ে কৃষকরা এগুলো চাষ করতে চান না, তবুও সোহেল রানার এই সংরক্ষণ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।”
সোহেল রানার আশা, তার এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ হারিয়ে যাওয়া ধানগুলো আবারও কৃষকের ঘরে ঘরে ফিরে আসবে এবং নতুন প্রজন্ম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এসব ধানের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.