তামাকের বিষবাষ্প সরে সবুজের বিপ্লব: শিম চাষে বদলে গেছে শ্যামগঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর:

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের শ্যামগঞ্জ গ্রাম। কয়েক বছর আগেও এই জনপদে তামাক চাষের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র এখন আমূল বদলে গেছে।

ক্ষতিকর তামাকের পরিবর্তে গ্রামের মাঠজুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে লতানো শিম গাছের সবুজ সমারোহ। অধিক মুনাফা এবং কম খরচে চাষাবাদ সম্ভব হওয়ায় এখানকার কৃষকরা তামাক ছেড়ে শিম চাষে ঝুঁকেছেন।

চলতি মৌসুমে গ্রামটিতে প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে শিমের আবাদ হয়েছে, যা শ্যামগঞ্জকে এলাকায় ‘শিমের গ্রাম’ হিসেবে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছে।

তামাকের বদলে শিমের মাচা: এক নতুন দৃশ্যপট সরেজমিনে শ্যামগঞ্জ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ জুড়ে বাঁশের মাচায় দুলছে শিম আর রঙিন ফুল। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গ্রামের সকলেই ব্যস্ত সময় পার করছেন শিম তোলারা কাজে।

একসময়ে তামাকের গন্ধে ভারি থাকা বাতাস এখন শিম ফুলের মৃদু সুবাসে পূর্ণ। এখান থেকে উৎপাদিত বিষমুক্ত শিম স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাজারে শিমের চাহিদাও ব্যাপক। পাইকারি বাজারে প্রতি মণ শিম বিক্রি হচ্ছে ২০০০ টাকা দরে, যা ধান বা তামাকের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক।

কৃষকের মুখে সচ্ছলতার হাসি শিম চাষ করে গ্রামের শত শত কৃষক পরিবার এখন স্বাবলম্বী। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে শিম চাষ করছেন মিনতি বালা। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “শিম চাষ করেই আমাদের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান হচ্ছে। গত ১০ বছর ধরে আমরা তামাক ছেড়ে শিম চাষ করছি এবং আল্লাহর রহমতে ভালো আছি।”

লাভের অংক কষে শিম চাষে আগ্রহ বেড়েছে অন্য কৃষকদেরও। কৃষক বিকাশ চন্দ্র রায় এ বছর ২ বিঘা জমিতে শিম চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “আমার খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। আশা করছি, মৌসুম শেষে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করতে পারব।”

একই মাচায় একাধিক ফসল: সফলতার কৌশল শ্যামগঞ্জের কৃষকরা কেবল শিম চাষেই থেমে নেই, তারা উদ্ভাবন করেছেন সাশ্রয়ী চাষ পদ্ধতি। কৃষক আইয়ুব আলী জানান তাদের কৌশলী চাষাবাদের কথা।

তিনি কৃষি প্রতিদিনকে বলেন, “আমরা একই জমিতে ও একই মাচায় একাধিক ফসল ফলাই। প্রথমে চালকুমড়া বা ঝিঙা চাষ করি। সেই ফসল শেষ হলে একই মাচায় শিমের আবাদ করি। এতে নতুন করে মাচা তৈরির খরচ লাগে না, ফলে লাভ বেড়ে যায়। এসব কারণেই গ্রামের মানুষ এখন তামাক চাষের নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসেছে।”

একনজরে সংবাদের হাইলাইটস:

  • পরিবর্তন: তারাগঞ্জের শ্যামগঞ্জ গ্রামে তামাক চাষ প্রায় বন্ধ, বর্তমানে ‘শিমের গ্রাম’ নামে পরিচিত।
  • পরিসংখ্যান: চলতি বছর ২০০ বিঘা জমিতে শিম চাষ, তামাক চাষ কমে ৪৯৫ হেক্টরে নেমেছে (যা আগে ছিল ৯৮৮ হেক্টর)।
  • অর্থনীতি: প্রতি মণ শিম বিক্রি হচ্ছে ২০০০ টাকায়; ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে লাখ টাকা আয়ের আশা কৃষকদের।
  • কৌশল: একই মাচায় প্রথমে চালকুমড়া/ঝিঙা এবং পরে শিম চাষ করে উৎপাদন খরচ কমাচ্ছেন কৃষকরা।

পরিসংখ্যানে তামাক চাষের পতন কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, তারাগঞ্জ উপজেলায় তামাক চাষের পরিমাণ প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে উপজেলায় ৯৮৮ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হতো, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। চলতি বছর মাত্র ৪৯৫ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে।

কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য কৃষকদের এই ইতিবাচক পরিবর্তনে খুশি কৃষি বিভাগ। তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায়  বলেন, “কৃষকদের তামাক চাষ থেকে সরিয়ে আনতে আমরা নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছি। শ্যামগঞ্জ গ্রামের কৃষকরা তামাক ছেড়ে শিম চাষ করে একটি দারুণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”

সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবাদত হোসেন পাইলট গ্রামটির প্রশংসা করে বলেন, “শ্যামগঞ্জ এখন স্বাবলম্বী কৃষকদের গ্রাম। তামাক অধ্যুষিত এলাকায় শিম চাষ করে তারা যে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।”

আরও পড়ুন …


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন