নিজস্ব প্রতিবেদক, পটুয়াখালী:
ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, আর শখ থেকে যে সফলতার জন্ম দেওয়া সম্ভব—তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পটুয়াখালীর গৃহবধূ তাসলিমা বেগম। তিন বছর আগে অন্যের বাগান থেকে শখ করে বরই কিনতে গিয়েছিলেন তিনি। সেই বাগানের থোকায় থোকায় ঝুলন্ত ফল আর সৌন্দর্য দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, মনে মনে বুনেছিলেন নিজের একটি বাগানের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে ধরা দিয়েছে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের গুয়াবাড়িয়া গ্রামের নদীর পাড়ে একসময়ের পতিত ও পরিত্যক্ত জমিটি আজ ফলের ভারে নুয়ে পড়া রঙিন বাগানে রূপ নিয়েছে। মাত্র ২০ শতাংশ জমিতে বরই চাষ করে তাসলিমা বেগম এখন এলাকার সফল নারী উদ্যোক্তা। তার এই সফলতা দেখে এলাকার অনেকেই এখন ঝুঁকছেন ফলের বাগানে।
শুরুর গল্প: ক্রেতা থেকে উদ্যোক্তা
তাসলিমা বেগমের এই কৃষি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটা বেশ চমকপ্রদ। ঘটনাটি তিন বছর আগের। পাশের গ্রাম পেয়ারপুরে একটি বরই বাগানে ফল কিনতে যান তিনি। সেখানে গাছে গাছে ঝুলন্ত বাহারি রঙের বরই দেখে তার চোখ জুড়িয়ে যায়। বাড়ি ফিরে তিনি স্বামীকে সেই অভিজ্ঞতার কথা জানান এবং স্বামীকে নিয়ে আবারও সেই বাগান পরিদর্শনে যান।
স্বামীর উৎসাহে তাসলিমা সিদ্ধান্ত নেন, বাড়ির সামনে নদীর পাড়ে যে ২০ শতাংশ জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, সেখানেই তিনি গড়ে তুলবেন নিজের বাগান। যেই ভাবা সেই কাজ। জমি পরিষ্কার করে প্রস্তুত করা হয় চাষের জন্য। যশোর থেকে সংগ্রহ করেন উন্নত জাতের প্রায় ২০০টি বরইয়ের কলম চারা। এর মধ্যে রয়েছে থাই আপেল কুল, কাশ্মীরি আপেল কুল এবং বলসুন্দরীসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় জাত।
পরিশ্রম ও পরিচর্যায় সফলতা
চারা রোপণ করলেই তো শেষ নয়, প্রয়োজন সঠিক পরিচর্যা। তাসলিমা বেগম অনেকটা সন্তানের মতোই যত্ন নিতে শুরু করেন গাছগুলোর। নিয়মিত সেচ, সার ও আগাছা পরিষ্কারের মাধ্যমে মাত্র এক বছরের মধ্যেই গাছগুলো বেড়ে ওঠে।
তাসলিমা বেগম বলেন, “প্রথমে এক বিঘার সমপরিমাণ জমিতে চারা এনে রোপণ করি। সার, ওষুধ ও পরিচর্যার মাধ্যমে কয়েক মাসেই গাছগুলো বড় হয়ে যায়। প্রথম বছরে খুব একটা লাভের মুখ না দেখলেও আমি হতাশ হইনি। খরচ উঠে এসেছিল, সেটাই ছিল সান্ত্বনা। কিন্তু দ্বিতীয় বছর থেকেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। গত বছর প্রায় এক লাখ টাকার মতো লাভ হয়েছিল।”
খরচ কম, লাভ বেশি
চলতি মৌসুমে তাসলিমা বেগমের বাগান যেন সেজেছে রঙিন সাজে। গাছে গাছে ঝুলছে লাল ও সবুজ রঙের বরই। এই নারী উদ্যোক্তা জানান, বরই চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, একবার চারা লাগালে কয়েক বছর ধরে ফল পাওয়া যায়। বারবার চারা কেনার বা রোপণের ঝামেলা নেই।
তিনি বলেন, “এ মৌসুমে বাগান পরিচর্যায় আমার খরচ হয়েছে মাত্র ২০ হাজার টাকা। আশা করছি, বাগানের সব ফল বিক্রি হলে প্রায় দেড় লাখ টাকা আয় হবে। অর্থাৎ খরচ বাদে পুরোটাই লাভ। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি বরই ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি ফল পাওয়ার আশা করছি।”
পরিবারের পাশে শক্ত অবস্থান
তাসলিমা বেগমের স্বামী চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন এবং ছেলে সৌদি আরব প্রবাসী। একসময় তাসলিমাও স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকতেন। কিন্তু এখন তিনি গ্রামেই থাকেন এবং বাগান দেখাশোনা করেন। গৃহিণী পরিচয়ের বাইরে তিনি এখন একজন উপার্জনক্ষম নারী। তার এই আয়ে পরিবারে এসেছে বাড়তি স্বচ্ছলতা। স্বামী ও ছেলের আয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, যা গ্রামীণ নারীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
এলাকাবাসীর চোখে ‘মডেল’ বাগান
তাসলিমার এই বাগানটি রাস্তার পাশে হওয়ায় পথচারীদের নজর কাড়ে সহজেই। ফল রক্ষায় চারপাশ বাঁশ ও জাল দিয়ে ঘেরা হয়েছে, যাতে পাখি বা অন্য কোনো প্রাণী ক্ষতি করতে না পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিবেশীরা জানান, তাসলিমা বেগম যখন গাছগুলো লাগিয়েছিলেন, তখন অনেকেই হয়তো গুরুত্ব দেননি। কিন্তু এখন তার বাগানের ফলন দেখে সবাই অবাক।
এক প্রতিবেশী বলেন, “গাছগুলো লাগানোর সময় থেকেই দেখছি তিনি খুব যত্ন করেন। তার বাগানের বরই খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু। আমরা এখন আর বাজার থেকে বরই কিনি না, নিজের চোখে বাগান দেখে বিষমুক্ত তাজা ফল এখান থেকেই কিনি। তার দেখাদেখি আমাদের এলাকার অনেক বেকার যুবক ও গৃহবধূ এখন বাড়ির আঙিনায় বরই চাষের পরিকল্পনা করছেন।”
পটুয়াখালীতে ফলের সম্ভাবনাময় বিপ্লব
পটুয়াখালী জেলা সাধারণত ধান ও মুগ ডাল উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এখানে ফলের বাগান খুব একটা দেখা যেত না। কিন্তু কৃষি বিভাগের সহায়তা ও তাসলিমার মতো উদ্যোক্তাদের কারণে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ধানের পাশাপাশি তরমুজ, বরই ও বিভিন্ন সবজি চাষে কৃষকরা এখন অধিক লাভবান হচ্ছেন।
পটুয়াখালী সদর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে সদর উপজেলায় বরই চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হেক্টর জমিতে। কৃষকদের আগ্রহ বাড়ায় চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হেক্টরে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য
পটুয়াখালী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম মজুমদার বলেন, “তাসলিমা বেগমের মতো উদ্যোক্তারা আমাদের কৃষির গর্ব। উপকূলীয় এই জনপদে ফলের বাগান করা চ্যালেঞ্জিং হলেও লাভজনক। আমাদের তথ্যানুযায়ী, প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ১১ দশমিক ৩৩ মেট্রিক টনেরও বেশি বরই উৎপাদন হয়েছে। ফলে পুরো উপজেলায় মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৩ মেট্রিক টন।”
তিনি আরও বলেন, “আপেল কুল, বাউকুল, বলসুন্দরীসহ নানা উন্নত জাতের বরই চাষে আমরা কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। তাসলিমার সাফল্য দেখে আমরা বরই চাষ সম্প্রসারণে আরও নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।”
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
তাসলিমা বেগম এখন স্বপ্ন দেখেন আরও বড় পরিসরে বাগান করার। তিনি প্রমাণ করেছেন, জমির আকার ছোট হোক বা বড়, সদিচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে সোনা ফলানো সম্ভব। অন্যের বাগান দেখে যে স্বপ্নের বীজ তিনি বুনেছিলেন, তা আজ ডালপালা মেলে মহীরুহে পরিণত হওয়ার পথে। তার এই উদ্যোগ উপকূলীয় জনপদের কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুন…
- পাহাড় নয়, সমতলেই কমলার রাজ্য: নিভৃত পল্লীতে হাবিবুরের বাজিমাত
- পাহাড়ের ঢালে ফুটল ‘স্বচ্ছলতা’: গাঁদা ফুল চাষে রিমার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
- গারো পাহাড়ে ৫০ জাতের বিদেশি আঙুরের সফল চাষ
Discover more from কৃষি প্রতিদিন
Subscribe to get the latest posts sent to your email.