২০২৬ সালের কৃষি প্রযুক্তি ট্রেন্ড: উৎপাদন বাড়াতে আসছে যেসব পরিবর্তন

  • এআই বিপ্লব: জেনারেটিভ এআই কৃষকদের ‘ভার্চুয়াল সহকারী’ হিসেবে কাজ করবে এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
  • কানেক্টিভিটি: স্পেসএক্স-এর মতো কোম্পানির সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারেও পৌঁছে যাচ্ছে উচ্চগতির ইন্টারনেট।
  • রোবোটিক্স: মানুষের তদারকিতে রুটিন কাজগুলো করবে রোবট, যা মাঝারি খামারগুলোর জন্যও সাশ্রয়ী হবে।
  • ভবিষ্যদ্বাণী: ডেটা ইন্টেলিজেন্স এখন সমস্যা হওয়ার আগেই সমাধান বা সতর্কবার্তা দেবে।
  • নতুন ভূমিকা: কৃষি উপকরণ বিক্রেতারা এখন কৃষকদের ‘ডিজিটাল পরামর্শদাতা’ হিসেবে কাজ করবেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্মার্ট প্রযুক্তি এখন আর কৃষিক্ষেত্রে কোনো বিলাসিতা বা অভিনব বিষয় নয়, বরং এটি আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনার হৃদপিণ্ডে পরিণত হয়েছে।

পরিবর্তনশীল আবহাওয়া ও বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে ২০২৬ সালের ফসল উৎপাদন মৌসুমে কৃষি প্রযুক্তি বা ‘এজি-টেক’ (AgTech) খাতে আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন।

সম্প্রতি ‘গ্লোবাল এজি টেক ইনিশিয়েটিভ’-এর সহযোগী ব্র্যান্ড ক্রপলাইফ (CropLife)-এর এক আলোচনায় তিনজন শীর্ষ শিল্প বিশেষজ্ঞ আগামী বছরের কৃষি দৃশ্যপট পরিবর্তনকারী ৬টি মূল প্রযুক্তির বা ট্রেন্ডের কথা তুলে ধরেছেন।

তাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স এবং উন্নত কানেক্টিভিটি আগামী দিনে কৃষকের মাঠের চিত্র পুরোপুরি বদলে দেবে।

১. প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও মূল চাবিকাঠি ‘মুনাফা’ স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও খামারের আকার ও অঞ্চলভেদে এর ভিন্নতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক কৃষি বিপণন বিশেষজ্ঞ এবং ‘Agworld’-এর হেড অব মার্কেটিং রেইন্ডার প্রিন্স জানান, বড় এবং সেবা-নির্ভর খামারগুলো প্রযুক্তি গ্রহণে এগিয়ে আছে, তবে ছোট খামারগুলো এখনও সতর্ক অবস্থানে।

যেসব প্রযুক্তি বা টুল সরাসরি লাভের অংক বাড়াতে সাহায্য করে, সেগুলোর ব্যবহারই সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল পরিকল্পনা প্ল্যাটফর্ম, ভেরিয়েবল-রেট অ্যাপ্লিকেশন (জমির উর্বরতা বুঝে সার/বীজ প্রয়োগ) এবং টেকসই কৃষি রিপোর্টিং।

‘Intelinair’-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও টিম হ্যাসিঞ্জার এ বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, “সফল হতে হলে প্রযুক্তিকে অবশ্যই কৃষকের বর্তমান কাজের ধারার সঙ্গে মানানসই এবং ব্যবহারবান্ধব হতে হবে।”

২. মাঠের নতুন সঙ্গী ‘জেনারেটিভ এআই’ এতদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পর্দার আড়ালে থেকে ফলনের পূর্বাভাস বা রোগের মডেল তৈরিতে কাজ করত। কিন্তু ২০২৬ সালে ‘জেনারেটিভ এআই’ কৃষকের সরাসরি ‘আলাপচারী সহকারী’ হিসেবে মাঠে নামবে।

এটি জটিল ডেটা বিশ্লেষণ করে কৃষকদের মাঠের উপযোগী সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই মানুষের দক্ষতাকে প্রতিস্থাপন করবে না, বরং কাজকে আরও নিখুঁত করবে। এটি মৌসুম ব্যবস্থাপনা, কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং স্বয়ংক্রিয় পরিকল্পনা তৈরিতে কৃষকদের সময় ও শ্রম বাঁচাবে।

৩. সংযোগ ব্যবস্থায় নতুন মোড়: স্পেসএক্স ও জন ডিয়ার ইন্টারনেট বা সংযোগ ব্যবস্থার অভাব গ্রামীন কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের বড় বাধা ছিল। তবে স্পেসএক্স (SpaceX) ও জন ডিয়ার (John Deere)-এর মতো প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব এই বাধা দূর করছে।

স্যাটেলাইট ও বিশেষ আইওটি (IoT) নেটওয়ার্কের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারেও এখন উচ্চগতির ডেটা আদান-প্রদান সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা একমত যে, ভবিষ্যতে কৃষকরা কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির সফটওয়্যারের (Proprietary lock-ins) মধ্যে আবদ্ধ থাকবেন না। বরং বিভিন্ন যন্ত্র ও সফটওয়্যার একে অপরের সঙ্গে কাজ করতে পারবে, যা ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ নামে পরিচিত।

৪. মানুষের নিয়ন্ত্রণে রোবোটিক্স ও অটোমেশন পুনরাবৃত্তিমূলক বা একঘেয়ে কাজের দক্ষতা বাড়াতে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা উন্নতি করছে। তবে পুরো মাঠ রোবটের দখলে যাবে না, বরং চালু হবে ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ (human-in-the-loop) ব্যবস্থা।

রেইন্ডার প্রিন্স ভবিষ্যদ্বাণী করেন, “ভবিষ্যতে রোবট সাধারণ বা রুটিন কাজগুলো করবে এবং মানুষ কৌশলগত দিক নির্দেশনা দেবে।” মডুলার এবং নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী ছোট ছোট রোবোটিক টুলগুলো এখন মাঝারি আকারের খামারগুলোকেও অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই অটোমেশনের সুবিধা দিচ্ছে।

৫. আগাম সতর্কবার্তা দেবে ‘ডেটা ইন্টেলিজেন্স’ কৃষি ডেটা বিশ্লেষণ এখন আর কেবল ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ বা ‘পোস্টমর্টেম’ নয়। এটি হয়ে উঠছে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বা ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’।

অর্থাৎ, সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই কৃষককে সতর্ক করা হবে। আধুনিক ডেটা সিস্টেমগুলো কৃষিতাত্ত্বিক, আর্থিক এবং টেকসই উন্নয়নের তথ্যগুলোকে একত্রিত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করবে। এতে শ্রমিক, যন্ত্রপাতি ও কৃষি উপকরণ ব্যবস্থাপনা আরও সাশ্রয়ী হবে।

৬. রিটেইলারদের নতুন ভূমিকা: ‘ডিজিটাল পরামর্শদাতা’ প্রযুক্তি কৃষি পরিচালনার কেন্দ্রে চলে আসায় কৃষি রিটেইলার বা খুচরা বিক্রেতাদের ভূমিকায় পরিবর্তন আসছে।

তারা এখন কেবল সার বা বীজ বিক্রেতা নন। কৃষিবিদ্যা, লজিস্টিকস এবং কমপ্লায়েন্সের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে রিটেইলাররা কৃষকদের বিশ্বস্ত ‘ডেটা পার্টনার’ বা ডিজিটাল পরামর্শদাতা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। এটি স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে তাদের আস্থার সম্পর্ক আরও মজবুত করছে।

সমন্বিত প্রযুক্তির জয়জয়কার বিশেষজ্ঞ প্রিন্স, রাউডি এবং হ্যাসিঞ্জার একমত যে, ২০২৬ সালের স্মার্ট কৃষির সফলতা কোনো একক যন্ত্রের ওপর নির্ভর করবে না। মানুষ, তথ্য এবং সিস্টেম—এই তিনে মিলে একটি সংযুক্ত ও কার্যকর কর্মপ্রবাহ তৈরি করতে পারলেই কেবল প্রযুক্তির সুফল পাওয়া যাবে। কৃষি এখন বিচ্ছিন্ন কোনো কাজ নয়, বরং একটি সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন … 


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন