জমি গিলেছে আবাসন, তবুও আমন উৎপাদনে ৩ লাখ টন বৃদ্ধির রেকর্ড গড়ল চট্টগ্রাম

  • রেকর্ড উৎপাদন: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আমন উৎপাদন প্রথমবারের মতো ১৭ লাখ ৩০ হাজার টন ছাড়িয়েছে।
  • জমির পরিসংখ্যান: গত ১৫ বছরে আবাদি জমি ৫ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর থেকে কমে ৫ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টরে নেমেছে।
  • মূল কারণ: জমি কমার পরেও উৎপাদন বাড়ার পেছনে উন্নত জাত ও আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা প্রধান।
  • উদ্বেগের বিষয়: গত পাঁচ বছরে তিন ফসলি জমি কমেছে ৪১ হাজার হেক্টরের বেশি; ফসলের নিবিড়তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ শতাংশে।
  • ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: উৎপাদন বাড়াতে আরও ৩০-৫০ হাজার হেক্টর অনাবাদি ও পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং ইটভাটায় টপ সয়েল বিক্রির কারণে গত দেড় দশকে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। অথচ বিস্ময়করভাবে ঠিক একই সময়ে আমন ধানের উৎপাদন বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাত এবং সার ব্যবস্থাপনার সঠিক প্রয়োগের ফলে জমি কমলেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর নিয়ে গঠিত এই কৃষি অঞ্চলে গত ১৫ বছরে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমলেও চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলে আমন উৎপাদন ১৭ লাখ ৩০ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে।

জমি কমার বিপরীতে উৎপাদনের উল্লম্ফন

 কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আমন আবাদ হয়েছিল ৫ লাখ ৮০ হাজার ৯২৩ হেক্টর জমিতে, যেখানে চাল উৎপাদন ছিল ১৪ লাখ ৫০ হাজার টন।

দেড় দশকের ব্যবধানে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ হেক্টরে। জমি কমলেও উন্নত ফলনের কারণে এবার চাল উৎপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৩০ হাজার ৯৮৯ টন। অর্থাৎ, জমির পরিমাণ কমলেও প্রযুক্তির কল্যাণে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টনের বেশি।

দুর্যোগ কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো

গত কয়েক বছর ধরেই এই অঞ্চলে উৎপাদন ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এর আগের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) অতিবৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ২৩ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ফলে উৎপাদন নেমে এসেছিল ১২ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৫ টনে।

তবে সেই ধাক্কা সামলে চলতি বছর কৃষকরা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯২ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৬ লাখ ১৯ হাজার ২৯০ টন চাল উৎপাদিত হয়েছিল।

কর্মকর্তারা কী বলছেন?

জমির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম বা পার্বত্য চট্টগ্রাম কৃষি উৎপাদনের জন্য উত্তরাঞ্চলের মতো এতটা জনপ্রিয় নয়। এখানকার মানুষ ব্যবসা বা প্রবাস জীবনকে বেশি প্রাধান্য দেয়। তাছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীতে জমি থেকে পানি দেরিতে নামায় চাষাবাদ বিলম্বিত হয়।”

তবে উৎপাদন বাড়াতে নতুন কৌশলের কথা জানান এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, “এই অঞ্চলে এখনো বেশ কিছু পতিত জমি রয়েছে। আমরা আগামী মৌসুমে নতুন করে আরও ৩০ থেকে ৫০ হাজার হেক্টর অনাবাদি জমি আমন আবাদের আওতায় আনার কাজ শুরু করেছি। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে অনাবাদি জমিকে আবাদযোগ্য করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।”

আরও পড়ুন… 

উৎপাদন বাড়লেও কমছে ফসলের নিবিড়তা

উৎপাদন বাড়লেও উদ্বেগের বিষয় হলো ফসলের নিবিড়তা (Crop Intensity) এবং তিন ফসলি জমির পরিমাণ কমে যাওয়া। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা ছিল ২০২ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ শতাংশে

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে তিন ফসলি জমির ক্ষেত্রে। ২০০৫-০৬ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত তিন ফসলি জমি ১ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টরে উন্নীত হয়েছিল।

কিন্তু আবাসন নির্মাণ, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং টপ সয়েল কেটে নেওয়ার কারণে শেষ পাঁচ বছরে তিন ফসলি জমি কমেছে প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৩ হেক্টরে।

বিশেষজ্ঞদের মত:

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে আবাদযোগ্য জমি কমে আসার কারণে এখন ‘নিবিড় চাষাবাদ’ বা একই জমিতে একাধিক ফসল ফলানোই উৎপাদন বৃদ্ধির মূল কৌশল। তবে মাঠপর্যায়ে সেচ সুবিধার অভাব এবং শ্রমিক সংকটের কারণে সব এলাকায় এটি কার্যকর করা যাচ্ছে না।

তারা সতর্ক করে বলছেন, উন্নত জাতের কারণে বর্তমানে উৎপাদন বাড়লেও, দীর্ঘমেয়াদে কৃষিজমি সুরক্ষা এবং তিন ফসলি জমি রক্ষায় কঠোর নীতিগত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন… 


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন