চা দোকানি থেকে সফল খামারি: ১২টি গাড়ল দিয়ে শুরু, এখন মূলধন ৪০ লাখ টাকা

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার নাটুদাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠের পাশে চোখ আটকে যায় একপাল গাড়লের দিকে। রাখালের ইশারায় কয়েকশ গাড়ল সুশৃঙ্খলভাবে ফিরছে খামারে। এই বিশাল গাড়ল বাহিনীর মালিক লিখন মণ্ডল, যিনি এলাকায় ‘হেবুল’ নামেই বেশি পরিচিত। একসময়ের সামান্য চা দোকানি হেবুল এখন এলাকার অন্যতম সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তার খামারে এখন গাড়লের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

সংগ্রাম থেকে সাফল্যের পথে

২০০৪ সাল। নাটুদাহ ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের হেবুলের বয়স তখন ৩০। অভাবের তাড়নায় প্রাথমিকেই লেখাপড়ার ইতি টানতে হয়েছিল। সংসার চালাতে নাটুদাহের ঐতিহাসিক আটকবর মোড়ে কাঠের টং দোকানে চা বিক্রি করতেন। কিন্তু সামান্য আয়ে সংসার চালানো ছিল দায়।

অভাবের কশাঘাত আর দারিদ্র্য ঘোচানোর স্বপ্ন থেকে হেবুল সিদ্ধান্ত নেন ভাগ্য পরিবর্তনের। তিল তিল করে জমানো টাকা আর ধারদেনা মিলিয়ে দুই লাখ টাকা পুঁজি জোগাড় করেন। এরপর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কৃষ্ণনগর থেকে আত্মীয়ের মাধ্যমে হাইক্রস ও অরিজিনাল—এই দুই জাতের ১২টি গাড়ল কিনে শুরু করেন যাত্রা। সেই ১২টি গাড়লই আজ তাকে ৫ শতাধিক গাড়লের মালিক বানিয়েছে।

সাফল্যের খতিয়ান

বর্তমানে হেবুলের খামারে দুই জাতের ৫৫০টি গাড়ল রয়েছে। এছাড়া তিনি ১২০টি ছাগল, ১৫০টি হাঁস-মুরগি ও কবুতরও পালন করছেন। হেবুল বলেন, “বর্তমানে খামারে যে গাড়ল আছে তার বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা। প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার গাড়ল বিক্রি করি। তিনজন রাখালের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে বছরে গড়ে ৫-৬ লাখ টাকা নিট লাভ থাকে।”

এই খামারের আয় দিয়েই তিনি জমি কিনেছেন, পাকা বাড়ি করেছেন, মোটরসাইকেল কিনেছেন এবং মেয়ের ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে এখন নবম শ্রেণিতে পড়ছে।

গাড়ল পালন কেন লাভজনক?

গাড়ল দেখতে অনেকটা ভেড়ার মতো হলেও এর আকার বড়, কান ও লেজ লম্বা। হেবুল জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক গাড়লের ওজন ৬০ থেকে ৮০ কেজি হয়, যা বাজারে ৫০-৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া দেড়-দুই মাস বয়সী বাচ্চা ৮-৯ হাজার এবং চার-পাঁচ মাস বয়সী বাচ্চা ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

মাংস সুস্বাদু হওয়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের বড় রেস্তোরাঁয় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ঈদের সময় এই চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা

হেবুলের খামারে ১০ বছর ধরে কাজ করছেন রাখাল আরমান। তিনি জানান, সকালে দানাদার খাবার ও সবুজ ঘাস খাওয়ানোর পর গাড়লগুলোকে চারণভূমি বা ফাঁকা মাঠে চরাতে নেওয়া হয়। সন্ধ্যায় আবার খামারে ফিরিয়ে আনা হয়।

হেবুল জানান, গাড়ল খুবই শান্ত স্বভাবের প্রাণী। নিয়মিত কৃমির ডোজ ও টিকা দিলে রোগবালাই কম হয়। তবে শীতকালে এদের বিশেষ যত্ন নিতে হয় এবং ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে হয়।

অনুপ্রেরণার উৎস ও সরকারি সহায়তা

হেবুলের সাফল্য দেখে এলাকার অনেকেই এখন গাড়ল পালনে ঝুঁকছেন। উপজেলার অন্তত ২০ জন বেকার যুবক তাকে অনুসরণ করে গাড়ল পালন শুরু করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ইমান আলী বলেন, “হেবুল একসময় অনেক কষ্টে জীবনযাপন করেছেন। এখন তিনি আমাদের এলাকার সফল উদ্যোক্তা এবং অনেকের অনুপ্রেরণা।”

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলায় ৪২ হাজার ৭২১টি গাড়ল পালন করা হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু দামুড়হুদা উপজেলাতেই রয়েছে ২১ হাজার ৩৯৭টি।

দামুড়হুদা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নীলিমা আক্তার হ্যাপি বলেন, “জেলায় গাড়ল পালনে হেবুল মণ্ডল একজন সফল ও বড় উদ্যোক্তা। এটি একটি সম্ভাবনাময় খাত। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে নিয়মিত তার খামারের গাড়লকে পিপিআর ভ্যাক্সিন ও কৃমিনাশক দিয়ে সহযোগিতা করা হয়।”


Discover more from কৃষি প্রতিদিন

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মতামত দিন